রবিবার সকাল আটটায় চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে চার দফা দাবির ভিত্তিতে ধর্মঘটের সূচনা হয়। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে কর্মীদের অব্যাহত বিরতি শুরু হওয়ায় জেটি ও বহির্নোঙরে চলমান শিপিং কার্যক্রম প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। মূল জেটিতে মোট বারোটি জাহাজ এবং বহির্নোঙরে পঞ্চাশেরও বেশি কার্গো জাহাজের মধ্যে পণ্য লোডিং ও আনলোডিং বন্ধ হয়ে রয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর তদারকি সকাল থেকে বন্দর এলাকায় দৃশ্যমান, যা কর্মীদের চলাচলকে সীমিত করে।
ধর্মঘটের মূল কারণ চারটি দাবি: প্রথমত, নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) বা ডিপিওয়ার্ল্ডকে ইজারা না দেওয়া; দ্বিতীয়ত, বন্দর চেয়ারম্যানের পদ থেকে প্রত্যাহার; তৃতীয়ত, ধর্মঘটে জড়িত কর্মীদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক পদক্ষেপের বাতিল; চতুর্থত, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া। এই চাহিদাগুলি পূরণ না হলে ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে বলে কর্মীরা জানিয়েছে।
ধর্মঘটের পূর্বে, ৩১ জানুয়ারি থেকে নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা না দেওয়ার দাবিতে কর্মীরা প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে তিন দিন বিরতি নিয়েছিল। এরপর মঙ্গলবার থেকে ধারাবাহিক বিরতি শুরু হয়, যার ফলে কন্টেইনার লোডিং-আনলোডিং সম্পূর্ণ থেমে যায়। বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে এক বৈঠকের পর দুই দিনের জন্য বিরতি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। তবে সেই সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায়, যেখানে আন্দোলনকারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের ইঙ্গিত দেয়া হয়। এই চিঠি এবং বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস.এম. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আন্দোলন উসকে দেওয়ার অভিযোগের পর কর্মীরা রবিবার থেকে ধারাবাহিক ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়।
ধর্মঘটের ফলে বন্দর পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। জেটি ও বহির্নোঙরে জাহাজের গতি থেমে যাওয়ায় রপ্তানি-আমদানি পণ্যের সময়সীমা বাড়বে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে রপ্তানি-নির্ভর শিল্প ও আমদানি-নির্ভর উৎপাদন ইউনিটগুলোতে কাঁচামাল ও পণ্যের বিলম্বের ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ধারাবাহিক ধর্মঘট বন্দর ব্যবহারকারী শিপিং কোম্পানি ও লজিস্টিক সেবাদাতাদের জন্য অতিরিক্ত খরচের কারণ হবে, যার ফলে কন্টেইনার ফি ও হ্যান্ডলিং চার্জে বৃদ্ধি প্রত্যাশিত।
বন্দরের নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর উপস্থিতি কর্মীদের চলাচলকে সীমিত করে, তবে কোনো প্রতিবাদে সহিংসতা ঘটেনি। কর্মীরা নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংলাপের সুযোগ চেয়েছে, তবে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। ধর্মঘটের সময় বন্দর পরিচালনা সংস্থা ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে আলোচনার দরজা বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বাজারে বন্দর বন্ধের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের স্রোত দেখা যাচ্ছে। শিপিং লাইনগুলো বিকল্প রুট বা বন্দর ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে, যা অতিরিক্ত লজিস্টিক খরচের দিকে নিয়ে যাবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের কাছ থেকে চাহিদা পূরণে বিলম্বের ফলে চুক্তি রদ বা শাস্তি আরোপের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, ধর্মঘটের সময়কাল বাড়লে বন্দর আয় ও দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে, যদি চার দফা দাবি পূরণ হয় এবং বন্দর পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে বন্দর ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক সম্পর্কের উন্নতি সম্ভব।
সারসংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে ধর্মঘটের মূল চালিকাশক্তি হল টার্মিনাল ইজারা, নেতৃত্বের পদত্যাগ, শাস্তিমূলক পদক্ষেপের বাতিল এবং আইনি হস্তক্ষেপের অব্যাহতি। ধর্মঘটের ফলে জেটি ও বহির্নোঙরে পণ্য চলাচল থেমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ক্ষতি, লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর উপস্থিতি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করলেও, সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত বন্দর কার্যক্রমে স্বাভাবিকতা ফিরে আসা কঠিন বলে মনে হচ্ছে।



