যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে গত দুই মাসে জেফ্রি এপস্টেইনের যৌন পাচার তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত লক্ষ লক্ষ নথি প্রকাশের পর, এই নথিগুলোর মধ্যে ভারতীয় ব্যবসায়ী অ্যানিল অম্বানির নাম উঠে এসেছে। নথি অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে অম্বানি ও এপস্টেইনের মধ্যে বার্তা বিনিময় হয়েছে। এই তথ্যগুলো ব্যবসা ও আর্থিক বাজারে নতুন উদ্বেগের সঞ্চার করেছে।
অমেরিকান ন্যায়বিচার মন্ত্রণালয় প্রকাশিত নথিগুলোতে এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্ত বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তির নাম ও তাদের যোগাযোগের রেকর্ড অন্তর্ভুক্ত। নথিগুলোতে দেখা যায়, এপস্টেইন তার নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে উচ্চ পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে গোপন চ্যাট রেকর্ড সংরক্ষণ করেছিল। এই প্রকাশের ফলে বিশ্বব্যাপী মিডিয়া ও আর্থিক বিশ্লেষকরা নথিগুলোর বিশদে মনোযোগ দিয়েছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এই নথিগুলোর ভিত্তিতে জানিয়েছে, অ্যানিল অম্বানি এবং এপস্টেইনের মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ধারাবাহিক বার্তা বিনিময় হয়েছে। নথিতে উল্লেখ আছে, দুই পক্ষের মধ্যে ব্যক্তিগত পছন্দ ও ভ্রমণ সংক্রান্ত আলোচনা হয়েছে, যা ব্যবসায়িক নয়, ব্যক্তিগত স্তরের যোগাযোগ হিসেবে চিহ্নিত।
বিশেষ করে ৯ মার্চ ২০১৭ তারিখের একটি চ্যাটে এপস্টেইন অম্বানিকে তার পছন্দের নারীর ধরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। অম্বানি উত্তর দেন, “তোমার প্রস্তাব শোনার জন্য প্রস্তুত।” এপস্টেইন এরপর একটি লম্বা সুইডিশ স্বর্ণকেশী নারীর প্রস্তাব দেন, যাতে অম্বানির ভ্রমণটি আরও আনন্দময় হবে। অম্বানি দ্রুতই উত্তর দেন, “এটি ব্যবস্থা করো।” এই সংলাপটি নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
এপস্টেইন একই চ্যাটে অম্বানির পছন্দের নারীর ধরন সম্পর্কে আরও কিছু রসিকতা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, “আশা করি তোমার পছন্দ মেরিল স্ট্রিপ নয়, না হলে আমি সাহায্য করতে পারব না।” অম্বানি উত্তর দেন, “বন্ধু, আমার রুচি তার চেয়ে ভিন্ন, আমাদের পরবর্তী চলচ্চিত্রে স্কারলেট জোহানসনের সঙ্গে কাজ করা যেতে পারে।” এই কথোপকথনটি ব্যবসায়িক নয়, ব্যক্তিগত রসিকতা হিসেবে নথিতে সংরক্ষিত।
উল্লেখযোগ্য যে, একই বছর রিলায়েন্স এন্টারটেইনমেন্ট, অম্বানির মালিকানাধীন কোম্পানি, হলিউডের “ঘোস্ট ইন দ্য শেল” চলচ্চিত্রের সহ-প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছিল। এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া অম্বানির হলিউড সংযোগের প্রেক্ষাপটে এপস্টেইনের প্রস্তাবটি আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
অ্যানিল অম্বানি বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটে আছেন। গত বুধবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলোকে অম্বানি ও তার সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ৪০,০০০ কোটি রুপির ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেয়। আদালতের এই আদেশের ফলে অম্বানির আর্থিক অবস্থা ও তার কোম্পানিগুলোর ঋণ কাঠামো পুনরায় পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এপস্টেইনের নথিতে অম্বানির নাম উঠে আসা রিলায়েন্স গ্রুপের শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রিলায়েন্সের মিডিয়া ও বিনোদন সেক্টরের ওপর সম্ভাব্য সুনামহানি, বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস কমাতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পের অর্থায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষত আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
অম্বানির আর্থিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত এই নতুন তথ্যগুলো, তার কোম্পানিগুলোর ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে। ঋণদাতারা অতিরিক্ত সুরক্ষা শর্ত আরোপ করতে পারেন, যা গ্রুপের নগদ প্রবাহে চাপ বাড়াবে। একই সঙ্গে, রিলায়েন্স এন্টারটেইনমেন্টের চলচ্চিত্র প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়বে, কারণ সুনামহানি ফান্ডিং ও বিতরণ চ্যানেলকে প্রভাবিত করতে পারে।
শেয়ারবাজারে অম্বানির সংযুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার মূল্যে সাময়িকভাবে হ্রাস দেখা গেছে। বিনিয়োগ বিশ্লেষকরা সতর্কতা জানিয়ে বলেছেন, এই ধরনের সুনামজনিত ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে গ্রুপের ক্যাপিটাল গঠন ও কৌশলগত পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই, শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি।
ভবিষ্যতে অম্বানি ও রিলায়েন্স গ্রুপকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে বাড়তি নজরদারির মুখোমুখি হতে পারে। এপস্টেইনের নথিতে প্রকাশিত চিঠিপত্রের ভিত্তিতে, আর্থিক ও সুনামগত ঝুঁকি হ্রাসের জন্য গ্রুপকে অভ্যন্তরীণ নীতি পুনর্গঠন, তৃতীয় পক্ষের অডিট এবং শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো না নেওয়া হলে, অতিরিক্ত আইনি ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা বাড়বে।
সারসংক্ষেপে, এপস্টেইনের নথিতে অ্যানিল অম্বানির সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রকাশ, তার বর্তমান আর্থিক সংকট ও ৪০,০০০ কোটি ঋণ জালিয়াতি তদন্তের সঙ্গে মিলিয়ে, রিলায়েন্স গ্রুপের ব্যবসায়িক পরিবেশে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। সুনাম রক্ষা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা গ্রুপের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।



