৭০ বছর বয়সী বিানা ওয়াট্রে মোমিন, মেঘালয়ের গারো হিলসের প্রাক্তন কলেজ শিক্ষক, ৩,০০০ কিলোমিটার দক্ষিণে কেরালায় গিয়ে একটি মালয়ালম চলচ্চিত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন, যা বর্তমানে নেটফ্লিক্সে স্ট্রিমিং হচ্ছে।
মোমিন গারো উপজাতির সদস্য, তুরা গভার্নমেন্ট কলেজে ইংরেজি সাহিত্য শিখাতেন এবং অবসর গ্রহণের পর চারটি কুকুরের যত্ন ও নাতি-নাতনীর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতেন। তার শহরে কোনো সিনেমা হল বা থিয়েটার না থাকায় অভিনয়ের কোনো স্বপ্ন কখনো জন্ম নেয়নি।
কিন্তু কেরালায় তার মেয়ের উৎসাহে তিনি নতুন কিছু চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেন। দীর্ঘ যাত্রা এবং অপরিচিত ভাষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও, মোমিনের মেয়ে তাকে আত্মবিশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, “নিজের উপর বিশ্বাস রাখো এবং কিছু নতুন করো”। এ কথার প্রেরণায় তিনি কেরালার পথে রওনা হন।
মোমিন যে চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন, তার নাম ‘একো’। নামটি ‘ইকো’ শব্দের সাথে খেলা করে, যা প্রতিধ্বনি নির্দেশ করে। ছবিটি মালয়ালম ভাষায় নির্মিত এবং পশ্চিম ঘাটের ঘন অরণ্য ও কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ের পটভূমিতে সেট করা। মোমিন ‘মলাথি চেট্টাথি’ নামের একাকী বৃদ্ধ নারীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, যিনি পশ্চিম ঘাটের এক দূরবর্তী গৃহে একা বসবাস করেন।
‘একো’ ৪৫ দিন মাত্রে সীমিত বাজেটে শুট করা হয়। ছবির দৃশ্যাবলী কুয়াশা ও সবুজে ভরপুর, এবং মোমিনের শান্ত স্বভাবের অভিনয় পুরো গল্পের নৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ছবির নির্মাণে প্রধানত স্থানীয় কাস্ট ও ক্রু যুক্ত ছিল, যা প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা বজায় রেখেছে।
চলচ্চিত্রটি নেটফ্লিক্সে প্রকাশের পর সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। বিশেষ করে মোমিনের স্বাভাবিক ও মৃদু পারফরম্যান্সকে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ছবির পরিবেশের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। তার অপ্রত্যাশিত উপস্থিতি দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং ছবির সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
‘একো’র পরিচালক দিনজিথ আয়্যাথান নতুন মুখের সন্ধানে ছিলেন। তিনি গারো উপজাতির এই শিক্ষিকাকে বেছে নেন, কারণ তিনি ছবির স্বতন্ত্র চরিত্রের জন্য প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা ও অভিজ্ঞতা প্রদান করতে সক্ষম ছিলেন। মোমিনের কোনো অভিনয় প্রশিক্ষণ না থাকলেও, তার শিক্ষকের পেশা তাকে মঞ্চে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।
মোমিন স্বীকার করেন, তিনি কখনো অভিনয়ের প্রশিক্ষণ পাননি, তবে ক্লাসরুমে শিক্ষাদানের সময় তিনি নিজেকে এক ধরনের পারফরম্যান্স হিসেবে দেখতেন। রোমান্টিক কবিতার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল, যা তার আবেগময় প্রকাশে সহায়তা করেছে।
প্রথমে তিনি ভাষা না জানার এবং দীর্ঘ যাত্রা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, তবে মেয়ের উৎসাহে তিনি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন। ছবির শুটিং চলাকালীন তিনি স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গে মৌলিক যোগাযোগের জন্য অঙ্গভঙ্গি ও হাসি ব্যবহার করে কাজ সম্পন্ন করেন।
মোমিনের এই অপ্রত্যাশিত যাত্রা বয়স বাড়ার পরেও নতুন কিছু শেখা ও চ্যালেঞ্জ গ্রহণের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার গল্পটি বিশেষ করে বয়স্ক প্রজন্মের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে পারে এবং দেখায় যে সৃজনশীল ক্ষেত্রের দরজা কখনো বন্ধ নয়।
বর্তমানে মোমিন কোনো নতুন প্রকল্পের ঘোষণা দেননি, তবে তিনি ভবিষ্যতে আরও কিছু চেষ্টা করতে ইচ্ছুক বলে প্রকাশ করেছেন। তার এই সাহসিকতা এবং নেটফ্লিক্সে সফল ছবির মাধ্যমে তিনি নতুন দিগন্তের দরজা খুলে দিয়েছেন।
মোমিনের গল্পটি দেখায় যে জীবনের শেষ পর্যায়েও স্বপ্ন অনুসরণ করা সম্ভব, এবং কখনো কখনো একটুখানি উৎসাহই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।



