লাহোরের পুরনো শহরের সংকীর্ণ গলিতে বসন্তের সূচনায় কাইট উড়ানোর ঐতিহ্যবাহী উৎসব বসন্ত আবার ফিরে এসেছে। ২০০৭ সালে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে প্রায় উনিশ বছর বন্ধ থাকা এই অনুষ্ঠানটি, এখন শহরের ছাদ ও খোলা মাঠে রঙিন পাখির মতো কাইটের ঝলকানি নিয়ে গর্জে উঠেছে। তরুণ ও বৃদ্ধ, পরিবার ও বন্ধুদের সমাবেশে রঙিন ডোরি, তীক্ষ্ণ কাঁচের থ্রেড এবং ড্রামবিটের গুঞ্জন একসাথে মিলিয়ে শহরের আকাশকে সজীব করে তুলেছে।
সন্ধ্যাবেলায় সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাদগুলোতে হাসি ও চিৎকারের স্রোত দেখা যায়। কাইটের ডোরি টানার সঙ্গে সঙ্গে কাইটগুলো একে অপরের চারপাশে ঘুরে, উঁচুতে উঠে এবং কখনও কখনও অন্যের কাইটকে কেটে মাটিতে নামিয়ে দেয়। এই প্রতিযোগিতামূলক দিকই উৎসবের মূল আকর্ষণ, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা তীক্ষ্ণ থ্রেড ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের কাইটকে আকাশ থেকে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
বাজারের গলিতে দেখা যায় ২৫ বছর বয়সী এক প্রযুক্তি ইঞ্জিনিয়ার, যিনি তার চাচার নির্দেশে কাইট উড়াতে শিখছেন। তিনি বলেন, “বয়স্করা কাইট উড়াতে পারদর্শী, কিন্তু আমাদের মতো তরুণরা এখনো শিখতে শিখতে আছি।” একইভাবে, ৪৮ বছর বয়সী এক গৃহিণী জানান, “এই উৎসব আমাদের জন্য শুধু কাইট নয়, পরিবারিক বন্ধন ও আনন্দের মুহূর্ত।”
বছরের পর বছর এই উৎসবের ঐতিহ্য লাহোরের রক্তে বোনা আছে। এক ফার্মাসিস্টের পরিবারে, তার বাবা ও দাদার সময়ে কাইট উড়ানো ছিল নিয়মিত রীতিনীতি, এবং এখন তার সন্তান ও নাতি-নাতনিরা এই ঐতিহ্যকে নতুন রূপে চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ামি থেকে আসা ৬০ বছর বয়সী এক বয়োজ্যেষ্ঠও এই উল্লাসে অংশ নিতে দূর থেকে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি বলেন, “এ ধরনের উৎসব মিস করা যায় না; এটাই আমাদের সংস্কৃতির অংশ।”
বসন্ত উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হল বসন্তের আগমনকে স্বাগত জানানো এবং সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করা। তবে ২০০৭ সালে কাইটের তীক্ষ্ণ ডোরি, উড়ন্ত কাইটের কারণে সৃষ্ট দুর্ঘটনা এবং কিছু ক্ষেত্রে আকাশে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটায় সরকার এই উৎসবকে নিষিদ্ধ করে। সেই সময়ে বহু মানুষ আহত হয় এবং কয়েকজনের মৃত্যু হয়, ফলে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়।
বছরের পর বছর পর, স্থানীয় প্রশাসন ও সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি করা হয়েছে। এখন কাইটের ডোরিতে কাঁচের গুঁড়ি ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং নিরাপদ উপকরণ ব্যবহার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, উড়ানোর সময় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, যাতে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
এই পুনরুজ্জীবিত উৎসবের মাধ্যমে লাহোরের বাসিন্দারা আবারও ঐতিহ্যবাহী রীতির আনন্দ উপভোগ করছেন। কাইট উড়ানোর পাশাপাশি, রাস্তার খাবার, মিষ্টি ও স্থানীয় সঙ্গীতের সুরে পরিবেশটি আরও রঙিন হয়ে উঠেছে। উড়ন্ত কাইটের ছায়া শহরের আকাশে এক ধরনের শিল্পকর্মের মতো দেখা যায়, যা তরুণ-যুবকদের সৃজনশীলতা ও প্রতিযোগিতার মনোভাবকে উদ্দীপ্ত করে।
উৎসবের পুনরায় শুরু লাহোরের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণকে নির্দেশ করে এবং ভবিষ্যতে নিরাপদে এই ঐতিহ্যকে বজায় রাখার জন্য সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করবে। শহরের বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা যদি এই ধরনের উল্লাসে অংশ নিতে চান, তবে নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা, তীক্ষ্ণ ডোরি ব্যবহার না করা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি। এভাবে আমরা ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করতে পারি।



