ইরান ইস্লামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সম্প্রতি তার ভূগর্ভস্থ “ক্ষেপণাস্ত্র নগরী” থেকে খোররামশাহর‑৪, যা খাইবারব্যালিস্টিক নামেও পরিচিত, প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেছে। এই নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের রেঞ্জ প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার, যা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ ভূখণ্ডে সরাসরি হুমকি পৌঁছানোর সক্ষমতা দেয়।
প্রদর্শনীতে দেখা যায়, ক্ষেপণাস্ত্রটি বায়ুমণ্ডলের বাইরে শব্দের গতির ১৬ গুণ দ্রুত, এবং প্রবেশের পর প্রায় ৮ গুণ গতি বজায় রাখে। এই গতি দিয়ে ১০ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যবিন্দুতে পৌঁছাতে পারে, ফলে শত্রু বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার সময় প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ওয়ারহেডের ওজন ১,৫০০ কেজি, যা ইরানের পূর্বের কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ধ্বংসক্ষমতা নির্দেশ করে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে খোররামশাহর‑৪-এ আধুনিক আরভান্দ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে, যা জ্বালানি ট্যাঙ্কের মধ্যে বিশেষভাবে সংযুক্ত, ফলে ক্ষেপণাস্ত্রের দৈর্ঘ্য কমে এবং স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ম্যানুভারেবল রিঅ্যান্ট্রি ভেহিকেল (এমএআরভি) প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে; শেষ পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্রটি নিজের গতি পথ পরিবর্তন করতে পারে এবং আটটি ছোট ইঞ্জিনের সাহায্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো ইলেকট্রনিক নির্দেশনা ছাড়াই লক্ষ্যভেদে উচ্চ নির্ভুলতা নিশ্চিত করে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, খোররামশাহর‑৪ শুধুমাত্র একটি নতুন অস্ত্র নয়, বরং ইরানের সামরিক কৌশলে একটি নতুন স্তরকে সূচিত করে। ভূগর্ভস্থ সুরক্ষিত অবকাঠামোতে এই সিস্টেমের অবস্থান শত্রু পক্ষের প্রাক-আক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা প্রদান করে। ফলে কোনো বাহ্যিক শক্তি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বহুবার পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকাশ ইরানের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে শক্তিশালী করবে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো, যেমন সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, এই নতুন ক্ষমতা বিবেচনা করে তাদের কূটনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই উন্নয়ন নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু দেশ ইরানের স্ব-রক্ষা অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে, তবে একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু সদস্য রাষ্ট্র ইরানের এই ধরণের উন্নয়নকে অঞ্চলের অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
ইরানের সরকার ইতোমধ্যে এই সিস্টেমের উৎপাদন ও মোতায়েনের সময়সূচি সম্পর্কে কোনো বিশদ প্রকাশ করেনি, তবে পূর্বের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষের দিকে প্রথম ব্যাচের সেবা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে, আইআরজিসি এই ক্ষেপণাস্ত্রের আরও উন্নত সংস্করণ এবং অতিরিক্ত ম্যানুভারেবল রিঅ্যান্ট্রি ভেহিকেল (এমএআরভি) সমন্বিত মডেল উপস্থাপন করার পরিকল্পনা করছে বলে জানা যায়।
অন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এই নতুন ক্ষমতাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং ইরানের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সম্ভাব্য উত্তেজনা হ্রাসের উপায় খুঁজবে। একই সঙ্গে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নতুন সমঝোতা ও সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হবে।
সারসংক্ষেপে, খোররামশাহর‑৪ ইরানের সামরিক ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন গতিবিধি সৃষ্টি করেছে। এই উন্নয়ন কূটনৈতিক আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করবে এবং ভবিষ্যতে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



