পাঁচ নারী ৫৩ বছর পর পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে এলেন, যা মানব পাচার সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তারা শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।
উল্লেখিত নারীরা মনোয়ারা খাতুন, রাবেয়া বিবি, জায়েদা, হাজেরা এবং আমেনা। তাদের প্রত্যাবর্তন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও দু’দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলের সমন্বয়ে সম্ভব হয়েছে।
খোঁজ নামে বাংলাদেশ ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এবং পাকিস্তানি মানবাধিকার কর্মী অলিউল্লাহ মারুফের যৌথ প্রচেষ্টায় এই পাঁচজনকে চিহ্নিত করা যায়। সংগঠনগুলো বহু বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে, যা শেষমেশ এই পুনর্মিলনের দিকে নিয়ে যায়।
এই নারীরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগে বা তার কাছাকাছি সময়ে, যখন বাংলাদেশ এখনও পূর্ব পাকিস্তান ছিল, তখনই পাচার করা হয়। তখন তাদের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে ছিল, এবং তারা অল্পবয়সে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, কোনো বৈধ পরিচয়পত্র বা ভ্রমণ নথি না থাকায় দেশে ফিরে আসা অসম্ভব ছিল। ফলে তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগও ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সমর্থনে, খোঁজ ও অলিউল্লাহ মারুফের দল শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান নির্ণয় করে, এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে। এই প্রক্রিয়ায় কূটনৈতিক অনুমোদন, ভিসা ইস্যু এবং নিরাপদ পরিবহন অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ধরনের মানব পাচার মামলায় দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা অপরিহার্য, এবং উভয় দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। তারা ভবিষ্যতে এধরনের ঘটনা রোধে তথ্য শেয়ারিং বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “পাঁচ দশকের পর এই নারীদের ফিরে আসা কেবল মানবিক দিক থেকে নয়, আন্তর্জাতিক আইনি দায়িত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই ঘটনা মানব পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তির বাস্তবায়নে ইতিবাচক উদাহরণ।
এ ধরনের পুনর্বাসন উদ্যোগ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে; ২০২৫ সালে লিবিয়া থেকে ৩০৯ বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রত্যাবর্তনও একই ধরণের সমন্বয়মূলক প্রচেষ্টার ফল ছিল। উভয় ক্ষেত্রে মানবাধিকার সংস্থার ভূমিকা ও কূটনৈতিক সংলাপের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানব পাচার বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্তে অবৈধ মানব সরবরাহের নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয়, তবে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও তথ্য আদানপ্রদান এ ধরণের নেটওয়ার্ককে দুর্বল করতে পারে। তারা সুপারিশ করেন, প্রত্যাবর্তিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে এই নারীদের জন্য পুনর্বাসন পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যার মধ্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানসিক পরামর্শ এবং পরিবার পুনর্মিলন প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে, সরকার মানব পাচার বিরোধী আইন প্রয়োগে কঠোরতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
পাঁচ নারীর দীর্ঘ সময়ের পর দেশে ফিরে আসা মানব পাচার মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা পুনরায় তুলে ধরে। এই ঘটনা ভবিষ্যতে অনুরূপ কেসে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।



