সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম শনিবার ঢাকার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জানালেন, দেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন বহু দলীয় প্রতিযোগিতার বদলে কার্যত দুই দলীয় রূপ নিতে পারে। তিনি এ কথা উল্লেখ করেন, যদিও পূর্বে বহু রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা করা হয়েছিল। এ ধরনের পরিবর্তন ভোটারদের পছন্দের গতিবিধি ও নীতিগত অগ্রাধিকারে প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্রিফিংটি সিপিডি ও ক্লাইমেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ যৌথভাবে আয়োজন করে, যার মূল বিষয় ছিল ‘নির্বাচনী এলাকায় সবুজ টেকসই অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রত্যাশা: প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল’। অনুষ্ঠানে জরিপের বিশদ ফলাফল উপস্থাপন করা হয় এবং ভবিষ্যৎ নীতি‑নির্ধারণে তা কীভাবে ব্যবহার করা যাবে তা আলোচনা করা হয়।
ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, অনুষ্ঠান সহযোগী সামি মোহাম্মদ, মালিহা সাবাহ ও নূর ইয়ানা জান্নাত, পাশাপাশি ক্লাইমেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কর্মসূচি পরিচালক শওকত আরা। সকলেই জরিপের পদ্ধতি ও ফলাফল বিশ্লেষণে অংশ নেন।
মোয়াজ্জেম উল্লেখ করেন, দ্বিদলীয় নির্বাচন কাঠামোতে নাগরিকদের বহুমাত্রিক চাহিদা প্রায়ই প্রার্থীদের নির্বাচনী পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে ভোটাররা প্রায়শই এমন প্রার্থীকে সমর্থন করেন, যাকে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হয়, যদিও তার নীতি পরিবেশের জন্য উপকারী হতে পারে।
এই প্রবণতা বিশেষ করে পরিবেশ‑সচেতন বা টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রার্থীদের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। জরিপে দেখা যায়, এমন প্রার্থীরা ভোটের দিক থেকে যথেষ্ট সমর্থন পায় না, যদিও তাদের পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে শহর ও গ্রাম উভয়ের জন্য উপকারী হতে পারে।
ভোটারদের সর্বোচ্চ উদ্বেগের তালিকায় বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তিনটি বিষয় শীর্ষে রয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭০ শতাংশেরও বেশি এই সমস্যাগুলোকে দেশের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং তা সমাধানের জরুরি প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছেন।
তবে জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যায়, ভোটার ও প্রার্থীরা এই সমস্যার মূল কারণ ও কাঠামোগত সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে অনিচ্ছুক। অধিকাংশই ঐতিহ্যবাহী ধারণার ওপর নির্ভর করে সমস্যার সমাধান খোঁজে, ফলে শিল্প‑সম্পর্কিত দূষণ উৎসের দিকে দৃষ্টিপাত কমে যায়।
পরিবেশগত সমস্যার সমাধান হিসেবে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা গাছ রোপণ, প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার ইত্যাদি পরিচিত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছেন। এসব প্রস্তাব সহজলভ্য ও স্বল্পমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য বলে বিবেচিত হয়, যদিও তারা দীর্ঘমেয়াদী দূষণ নিয়ন্ত্রণের মূল বিষয়কে স্পর্শ করেনি।
বৈধ ও অবৈধ শিল্প, ইটভাটা, রাসায়নিক কারখানা এবং অন্যান্য বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলোকে সমাধানের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। বিশ্লেষকরা অনুমান করেন, অংশগ্রহণকারীরা হয় এই উৎসগুলো সম্পর্কে অপর্যাপ্ত তথ্য রাখে, অথবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপের কারণে এসব বিষয়ে কথা বলতে ভয় পায়।
এই ধরনের জ্ঞানগত ফাঁক ও স্বয়ংসীমিত আলোচনার ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পরিবেশ সংক্রান্ত নীতি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। দু’দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভোটারকে জয়ী প্রার্থীর দিকে ধাবিত করে, ফলে টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার পিছিয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দেন, যদি সরকার ও সিভিল সোসাইটি এই ফাঁকটি পূরণ করতে না পারে, তবে পরবর্তী নির্বাচনে পরিবেশ‑সচেতন প্রোগ্রামগুলো রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে উঠে আসা কঠিন হবে। তাই নির্বাচনী প্রচারাভিযান ও পার্টির ম্যানিফেস্টোতে সবুজ নীতি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
অবশেষে, সিপিডি ও ক্লাইমেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ উভয়ই উল্লেখ করেছেন, ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধি, শিল্প‑দূষণ নিয়ন্ত্রণের আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য বহুমুখী প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এ ধরনের পদক্ষেপই দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনে টেকসই উন্নয়নের স্থান নিশ্চিত করতে পারে।



