শুক্রবার সকাল প্রায় ৯টা ৩০ মিনিটে কুষ্টিয়া জেলায় দৌলতপুর থানা অধীনে অবস্থিত দৌলতখালী গ্রামের হাজীপাড়া এলাকায় একটি ট্র্যাফিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিনজন কিশোর প্রাইভেট মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ইজিবাইকে সাইট দিতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্যুৎখুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খায়। ফলস্বরূপ দুই কিশোরের প্রাণ যায় এবং তৃতীয়জন গুরুতরভাবে আহত হয়।
মৃতদেহের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। চৌহদ্দিপাড়া গ্রামের হেকমত আলীর ১৪ বছর বয়সী ছেলে রহমত আলী এবং একই গ্রামের আমিনুল ইসলামের ১৪ বছর বয়সী ছেলে সাহাবী দুজনই দৌলতখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। আহত কিশোরের নাম সাইফ আলী, যিনি একই এলাকার জিয়ার আলীর ১৪ বছর বয়সী পুত্র; তিনি কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জরুরি বিভাগে ভর্তি হয়েছেন।
দৌলতপুর থানা পরিদর্শক আলি মর্তুজা জানান, ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ ও সাক্ষীরা নিশ্চিত করেছেন যে তিনজন কিশোরই একসাথে প্রাইভেট মোটরসাইকেলে যাত্রা করছিল। ইজিবাইকে সাইট দিতে গিয়ে গতি কমাতে না পারায় গাড়ি সড়কের পাশে থাকা বিদ্যুৎখুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খায়। বিদ্যুৎখুঁটির ধাতব গঠন ও উচ্চতা গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার হোসেন ইমাম জানান, বেলা প্রায় ১১টা ৩০ মিনিটে অচেতন অবস্থায় তিন কিশোরকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক দল দুইজনকে মৃত ঘোষণা করে, আর সাইফ আলীর মাথায় গুরুতর আঘাতের ফলে তার অবস্থা সংকটজনক রয়ে যায়। হেড ইনজুরি এবং বিদ্যুৎখুঁটির সঙ্গে সরাসরি ধাক্কা রোগীর শারীরিক ক্ষতি বাড়িয়ে দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দৌলতখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হারুনার রশিদ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “শিক্ষক হিসেবে সন্তান হারানোর বেদনা অম্লান।” তিনি তৎক্ষণাৎ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে মৃত কিশোরদের পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে বলেন, “এ ধরনের অপমৃত্যু আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য অগ্রহণযোগ্য।” রশিদ আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে এবং বিদ্যালয় ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের বাইক নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
বিদ্যালয়ের এই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কিছু সময়ে শিক্ষার্থীরা বাইক নিয়ে আসার ঘটনা ঘটতে থাকে, যার ফলে রশিদ প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রশাসনকে বলছি, এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ দেখা যায়নি।” রশিদের মতে, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তদারকি প্রয়োজন।
পুলিশের মতে, দুর্ঘটনার পরপরই গাড়ি চালকের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে গাড়ি চালক কিশোর রহমত আলীর বাবা হেকমত আলীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। হেকমত আলীর মোবাইল নম্বরে কল করা হলেও তিনি উত্তর দেননি। পুলিশ ঘটনাস্থলে প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং গাড়ি চালকের দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক পরীক্ষা ও গতি মাপার ডেটা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, বিদ্যুৎখুঁটির সঙ্গে ধাক্কা ঘটিয়ে প্রাণহানি ঘটানো গাড়ি চালকের বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। স্থানীয় আইন অনুসারে, গতি সীমা অতিক্রম, সাইট না দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি সৃষ্টি করা অপরাধের মধ্যে পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত শেষ হলে, প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।
দৌলতখালী গ্রাম ও আশেপাশের এলাকায় এই ধরনের দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের সুর বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে অনুরোধ করা হয়েছে, বিদ্যুৎখুঁটির নিরাপত্তা মানদণ্ড পুনর্বিবেচনা করে সড়ক পার্শ্বে এমন কাঠামো স্থাপন করা যাতে গাড়ি চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি কমে। এছাড়া, স্কুল ও কমিউনিটি স্তরে শিশু ও কিশোরদের সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা জরুরি।
দুর্ঘটনা ঘটার পর থেকে কুষ্ঠিয়া জেলায় ট্র্যাফিক নিরাপত্তা বিষয়ক একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে পুলিশ, হাসপাতাল, শিক্ষা বিভাগ এবং স্থানীয় স্বশাসন প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে, বিদ্যুৎখুঁটির আশেপাশে সাইনেজ স্থাপন, গতি সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এই দুঃখজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, স্থানীয় সমাজের শোকের ছায়া ছড়িয়ে আছে এবং কিশোরদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য সকল স্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন।



