লোহাগাড়া উপজেলার ডেলিয়াপাড়া এলাকায় গত মঙ্গলবার শেষ হওয়া রাস্তাসংস্কার কাজের মাত্র দুই দিন পরই বিটুমিন ও পাথরের কার্পেটিং খুলে যাওয়া দেখা গেছে। রাস্তাটি ২০২০-২১ অর্থবছরে এক হাজার পঞ্চাশ মিটার অংশের জন্য সরকার থেকে ৯৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল এবং স্থানীয় ঠিকাদার মেসার্স দিপু কান্তি পালকে কাজের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কাজটি জুন ২০২৪-এ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল, তবে শেষের দিকে একাধিক স্থানে কার্পেটিং উঠে যাওয়া শুরু হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে একটি ট্রাক ডেলিয়াপাড়া এলাকায় হঠাৎ ব্রেক করলে কার্পেটিং উঁচু হয়ে গিয়েছিল এবং তা থেকে রাস্তায় গর্ত তৈরি হয়। গর্তের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় মানুষ হাত দিয়ে কার্পেটিং তুলে ফেলেছে। এই ঘটনায় রাস্তাটির পুনরায় সংস্কার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাস্তাটির মোট বরাদ্দের মধ্যে প্রায় নয় লাখ টাকা জামানত হিসেবে রাখা হয়েছিল। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী, কাজ সম্পন্নের এক বছর পর ঠিকাদারকে এই জামানত ফেরত দিতে হবে, তবে একই সঙ্গে রাস্তায় কোনো অতিরিক্ত সংস্কার প্রয়োজন হলে তা ঠিকাদারই করতে হবে। এই শর্তের ফলে ঠিকাদারকে কাজের গুণগত মানের চেয়ে জামানত ফেরত পাওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য যে, গত বছরও একই রাস্তায় অনুরূপ সমস্যার অভিযোগ উঠেছিল, যখন প্রথম সংস্কার কাজের এক বছরও টিকেনি। পুনরায় সংস্কারকালে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ আবার উঠে এসেছে, যা রাস্তাটির দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এলজিইডি কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী ময়নুল ইসলাম জানান, ঠিকাদার কাজের সময় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করেছে এবং কাজের সঠিক সমাপ্তি না দেখিয়ে জামানত ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, কাজের গুণমান নিশ্চিত না হলে জামানত ফেরত দেওয়া হবে না।
দিপু কান্তি পাল, যিনি রাস্তাসংস্কারের মূল ঠিকাদার ছিলেন, ছয় মাস আগে মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পর, তার সহযোগী জাকারিয়া বাবুল নামে একজন স্থানীয় ব্যক্তি একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ চালিয়ে গেছেন। জাকারিয়া বাবুলের তত্ত্বাবধানে রাস্তাটির পুনর্নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তবে গুণগত মানের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় প্যানেল চেয়ারম্যান লেয়াকত আলি উল্লেখ করেন, রাস্তাটির সংস্কার কাজের সময় অনিয়মের অভিযোগ প্রথমবারই নয়, বরং বারবার উঠে এসেছে। তিনি রাস্তাটির পুনর্নির্মাণে শর্তাবলী মেনে চলার দাবি পুনরায় তীব্রভাবে প্রকাশ করেছেন।
এই ঘটনার ফলে স্থানীয় প্রশাসন ও এলজিইডি উভয়েরই কাজের গুণমান পর্যবেক্ষণ ও দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। রাস্তাটির পুনরায় সংস্কার না হলে, বর্ষাকালে গর্তের মাধ্যমে পানির সঞ্চয় ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে, যা পথচারী ও গাড়ি চালকদের জন্য বড় সমস্যার সৃষ্টি করবে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, রাস্তাসংস্কার কাজের এই ধরণের ব্যর্থতা স্থানীয় নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। রাস্তাটির অবস্থা নিয়ে স্থানীয় নেতারা ও দলীয় কর্মীরা তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি দাবি করছেন। ভবিষ্যতে রাস্তাটির পুনর্নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দ, কঠোর তদারকি এবং প্রকল্পের শর্তাবলীর পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
এলজিইডি ইতিমধ্যে জামানত ফেরত না দিয়ে কাজের গুণমান যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় হলে পুনরায় সংস্কার কাজের জন্য নতুন দরপত্র প্রকাশের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। স্থানীয় প্রশাসনও রাস্তাটির অবস্থা দ্রুত ঠিক করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
রাস্তাটির পুনর্নির্মাণে অংশগ্রহণকারী সকল সংস্থা ও ঠিকাদারকে গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ সমস্যার পুনরাবৃত্তি না হয়। রাস্তাটির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সময়মতো মেরামত নিশ্চিত করা স্থানীয় জনগণের মৌলিক অধিকার, যা সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব।
এই ঘটনা রাস্তাসংস্কার প্রকল্পে তহবিলের সঠিক ব্যবহার, কাজের মানদণ্ডের প্রয়োগ এবং প্রকল্পের তদারকি ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে রাস্তাসংস্কার কাজের জন্য স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া, কঠোর মানদণ্ড এবং সময়মতো তদারকি নিশ্চিত করা হলে, স্থানীয় জনগণের মৌলিক অবকাঠামো সেবা উন্নত হবে।



