বছরের শেষের দিকে নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ৪০,০০০টি বডিওর্ন ক্যামেরা ২৬৯ কোটি টাকায় ক্রয় করা হয়। এই ক্যামেরা সরাসরি স্মার্ট টেকনোলজিস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, যা সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কন্যাদের যৌথ প্রতিষ্ঠা। ক্যামেরা ব্যবহার করবে পুলিশ, তবে ক্রয় প্রক্রিয়া ও সরবরাহ নিয়ে ইতিমধ্যে বিতর্ক তীব্রতা পেয়েছে।
গত বছর ৯ আগস্ট সরকারী উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বডিওর্ন ক্যামেরা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই দিনে স্মার্ট টেকনোলজিসকে সব পুলিশ টেন্ডার প্রদান করা হয়, যা আওয়ামী লীগের প্রভাবের অধীনে কাজ করা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জন্য ইউএনডিপি (UNDP) মাধ্যমে সব লেনদেন সম্পন্ন করার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল।
স্মার্ট টেকনোলজিসের মালিকানা সম্পর্কে জানা যায় যে, বেনজীর আহমেদের এক কন্যা এবং আ হ ম মুস্তফা কামালের কন্যা একসাথে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। দুজনের রাজনৈতিক সংযোগের কথা উল্লেখ করা হয়, যা টেন্ডার প্রাপ্তিতে সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বডিওর্ন ক্যামেরা সরবরাহে স্মার্ট টেকনোলজিসের পাশাপাশি দাহুয়া, টিডিটেক, কেডাকম ও অকজন নামের চারটি প্রতিষ্ঠানও যুক্ত ছিল। তবে দাহুয়া ক্যামেরা ক্রয় সংক্রান্ত তথ্য অস্বীকার করেছে, অন্য কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ক্যামেরা মাঠ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর পুলিশ টেলিকম বিভাগ তথ্য শেয়ার করতে অনীহা প্রকাশ করেছে। সরবরাহের সঠিক পরিমাণ ও স্থিতি সম্পর্কে স্পষ্টতা না থাকায় বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনো গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে কিনা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, যদি ক্যামেরা নির্বাচনের সময়ে সঠিকভাবে কাজ না করে, তবে পুলিশকে আইনগত ও পরিচালনাগত সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। রেজাউল করিম সোহাগের মতামত অনুযায়ী, বডিওর্ন ক্যামেরার কার্যকারিতা না থাকলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পেতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া বিভাগে এআইজি (মিডিয়া) কর্মকর্তার মতে, বডিওর্ন ক্যামেরা ইতিমধ্যে পুলিশ ইউনিটে পৌঁছেছে এবং ব্যবহার শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। তবে ক্যামেরার প্রযুক্তিগত দিক ও ডেটা সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী লীগের প্রভাবাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারী টেন্ডার পেতে পারলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। ভবিষ্যতে ক্যামেরার কার্যকারিতা ও ব্যবহারিকতা পর্যবেক্ষণ করা হবে, যা নির্বাচন নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সোর্সের তথ্য অনুযায়ী, স্মার্ট টেকনোলজিস চীনের সরবরাহকারী থেকে গোপনভাবে ক্যামেরা সংগ্রহ করেছে, যার চূড়ান্ত মূল্য সরকারী ঘোষিত মূল্যের তুলনায় কম বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিষয়টি দুর্নীতি সন্দেহ বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সব ক্রয় UNDP তহবিলের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হবে এবং প্রতিটি ধাপের নথিপত্র প্রকাশ্য হবে বলে বলা হয়েছিল। তবে বর্তমানে ক্যামেরা সরবরাহের সময়সূচি ও অর্থপ্রবাহের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় এই শর্তের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
পুলিশের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ক্যামেরা ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা না থাকলে কার্যকারিতা সীমিত হবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন যে, ক্যামেরা সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে নির্বাচনী পর্যবেক্ষণে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা অর্জন করা কঠিন হবে।
সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে যে, ক্যামেরার কার্যকারিতা ও ডেটা ব্যবস্থাপনা মূল্যায়নের জন্য একটি তদারকি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি আগামী সপ্তাহে প্রথম সভা করে সরবরাহের অগ্রগতি, ব্যবহারিকতা এবং সম্ভাব্য সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করবে।



