লন্ডনের কেন্দ্রীয় চারটি লেনের ব্যস্ত রাস্তায় দশ মিনিটের জন্য দাঁড়িয়ে বায়ু দূষণের প্রভাব সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী নিজে শ্বাসের মাধ্যমে ট্র্যাফিকের ধোঁয়া গ্রহণ করে, পরে ল্যাবরেটরিতে রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শারীরিকভাবে বায়ু দূষণ কীভাবে দেহে সঞ্চিত হয় তা প্রথমবারের মতো দৃশ্যমান করা সম্ভব হয়েছে।
পরীক্ষার সময় রাস্তায় গাড়ির গর্জন, সাইরেন এবং টায়ার ও ব্রেকের ঘর্ষণ থেকে নির্গত কণাগুলি শ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে। অংশগ্রহণকারীকে নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে দশ মিনিটের জন্য শ্বাস নিতে বলা হয়, যাতে লন্ডনের গড় ট্র্যাফিক দূষণের মাত্রা গ্রহণ করা যায়। এরপর ল্যাবরেটরিতে ফিরে আঙুলের রক্তের ফোঁটা সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
যুক্তরাজ্যে বায়ু গুণমানের অবনতি প্রতি বছর প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ বলে অনুমান করা হয়। গর্ভস্থ শিশুর বিকাশ, হাঁপানি, হৃদরোগ এবং ডিমেনশিয়া সহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি এই দূষণের ফলে বাড়ে। তাই বায়ু দূষণকে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুতর হুমকি হিসেবে গণ্য করা হয়।
শ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করা অধিকাংশ দূষণ ট্র্যাফিকের নিঃসরণ থেকে আসে; গাড়ির এক্সহস্ট থেকে নির্গত ধোঁয়া, টায়ার ও ব্রেকের ঘর্ষণ থেকে উত্পন্ন ক্ষুদ্র কণাগুলি প্রধান উৎস। এই কণাগুলি দৃশ্যমান না হলেও শ্বাসের পথে সহজে প্রবেশ করে। বিশেষ করে সূক্ষ্ম কণাগুলি, যাকে PM2.5 বলা হয়, শ্বাসনালীর গভীরে পৌঁছাতে সক্ষম।
গবেষণার জন্য নির্বাচিত স্থানটি গবেষকের মতে ‘এক্সপোজার চেম্বার’ হিসেবে কাজ করে। এখানে গাড়ির গর্জন ও ধোঁয়ার ঘনত্ব উচ্চমাত্রায় থাকে, যা স্বাভাবিক শহুরে পরিবেশের প্রতিনিধিত্ব করে। অংশগ্রহণকারীকে এই পরিবেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাখা হয়, যাতে বাস্তবিক শ্বাসের পরিমাণ মাপা যায়।
সাধারণ ধারণা যে শ্বাসের পথে প্রবেশ করা ধোঁয়া নাক বা মুখের মাধ্যমে ফিল্টার হয়ে বেরিয়ে যায়, তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সূক্ষ্ম কণাগুলি শ্বাসনালীর মাধ্যমে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। ফলে এই কণাগুলি শ্বাসনালীতে আটকে না থেকে পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়ে।
এই গবেষণার মূল প্রশ্ন ছিল, ক্ষুদ্র কণাগুলি কি শুধুমাত্র ফুসফুসে আটকে থাকে, নাকি রক্তের মাধ্যমে পুরো শরীরে ছড়িয়ে যায়। পরীক্ষার ফলাফল দেখায় যে PM2.5 কণাগুলি রক্তকণিকায় সংযুক্ত হয়ে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে। ফলে বায়ু দূষণ সরাসরি রক্তের গুণগত মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
দশ মিনিটের শ্বাস নেওয়ার পর অংশগ্রহণকারীকে আঙুলের রক্তের ফোঁটা নিয়ে স্লাইড প্রস্তুত করা হয়। মাইক্রোস্কোপের নিচে রক্তকণিকা স্বাভাবিকভাবে লাল ডিস্কের আকারে দেখা যায়, যা অক্সিজেন পরিবহন করে। তবে কয়েক মিনিটের পর্যবেক্ষণের পর রক্তকণিকায় অস্বাভাবিক কালো দাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই কালো দাগগুলো রক্তের লাল কোষের পৃষ্ঠে লেগে থাকা ক্ষুদ্র কণারূপে দেখা যায়। এগুলি মূলত অপ্রতিপূর্ণ জ্বালানী দহন থেকে উৎপন্ন কার্বন ও অন্যান্য রাসায়নিকের ক্ষুদ্র কণার সমষ্টি। মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়, প্রতিটি দাগ একধরনের ক্ষুদ্র কয়লা গুঁড়োর মতো।
বৈজ্ঞানিকভাবে এই কণাগুলিকে PM2.5 বলা হয়, যার ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম। এত ছোট কণাগুলি শ্বাসের মাধ্যমে সহজে ফুসফুসের অ্যালভিয়োতে প্রবেশ করে এবং রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। এই পর্যবেক্ষণ প্রথমবারের মতো সরাসরি রক্তের মধ্যে বায়ু দূষণের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
এই ফলাফল বায়ু দূষণ এবং মানব স্বাস্থ্যের সরাসরি সংযোগকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। পূর্বে কেবল পরিসংখ্যানিক ডেটা থেকে অনুমান করা হতো, এখন রক্তের মধ্যে কণার উপস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে বায়ু গুণমানের উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সরবরাহ করবে।
বায়ু দূষণের ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় স্তরে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। গাড়ির ব্যবহার কমানো, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং শ্বাসনালী রক্ষা করার জন্য মাস্ক ব্যবহার করা কার্যকর হতে পারে। আপনি কি আপনার দৈনন্দিন জীবনে বায়ু দূষণ কমাতে কিছু পরিবর্তন করবেন?



