বন্দরবনের হংসামা গ্রামে আসন্ন পার্লামেন্টারি নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় বাসিন্দারা ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রধান দাবি হিসেবে উঠে এসেছে। গ্রামটি শহরের প্রায় আট মাইল দূরে, বনের ঢালে অবস্থিত এবং বেশিরভাগ ঘর কাঠের স্তম্ভে তোলা, বাঁশের দেয়াল ও টিনের ছাদে তৈরি। গ্রামের প্রবেশদ্বারে একটি ছোট চা দোকান রয়েছে, যা বাঁশের প্ল্যাটফর্মে নির্মিত এবং বাসিন্দাদের মিলনস্থল ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কাজ করে।
চা দোকানের মালিক ওমনু মারমা, মধ্যবয়সী মারমা নারী, নির্বাচনের আগমনে ভোট দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি নতুন মন্ত্রী নির্বাচিত হলে ভোট দেবেন বলে উল্লেখ করেন, যা সম্ভবত জেলার নতুন সংসদ সদস্যের দিকে ইঙ্গিত করে। ভোটের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বাংলা ভাষায় সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে হেসে হেসে দ্বিধা করেন, তবে শেষমেশ নিরাপদ ও সুরক্ষিত জীবনযাপনকে মূল চাহিদা হিসেবে প্রকাশ করেন।
ওমনু মারমা নিরাপত্তা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশের সময় বলেন, “আমরা নিরাপদে ও শান্তিতে থাকতে চাই”। তিনি বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে হ্যাঁ, তবে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন। তার উদ্বেগের মূল কারণ হল এক বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা, যেখানে কিছু প্রভাবশালী বাংলা ব্যবসায়ী গ্রামীয় পারা নামে পরিচিত বৃহৎ বনভূমি দখলের চেষ্টা করেন। এই প্রচেষ্টা গ্রামবাসীর মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি করে, যদিও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি শীতল হয়, তবে ভয় ও অনিশ্চয়তা এখনও বিদ্যমান।
বন্দরবনের নিরাপত্তা বিষয়টি কেবল একক ঘটনার সীমা অতিক্রম করে, এটি দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রামগুলোতে চেকপয়েন্ট, গশ্বর ও চলাচলের নিয়মাবলী প্রায়ই দেখা যায়, যা বাসিন্দাদের চলাচলকে সীমিত করে এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে চেতনা জাগিয়ে তোলে। এই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থানীয় জনগণের জন্য কেবল শারীরিক সুরক্ষা নয়, মানসিক নিরাপত্তার প্রতীকও বটে।
চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টসের ইতিহাসে প্রায় দুই দশক দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের পর ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি রাষ্ট্র ও আদিবাসী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ শেষের সূচনা করে এবং অবসান, স্বায়ত্তশাসন ও সামরিকীকরণ হ্রাসের আশার বাতিঘর জ্বালায়। তবে চুক্তির পরিপূর্ণতা সীমিত রয়ে যায়; সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে হ্রাস পায়নি এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের বাস্তবায়ন ধীরগতিতে অগ্রসর হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক পটভূমি বর্তমান নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন সংসদ সদস্যের নির্বাচনে গ্রামবাসী আশা করে যে, তিনি নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে পদক্ষেপ নেবেন এবং পারা দখলের মতো সংঘাতের পুনরাবৃত্তি রোধ করবেন। একই সঙ্গে, তারা চায় যে, চুক্তির অধীনে প্রতিশ্রুত স্বায়ত্তশাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, যাতে সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে, হংসামা গ্রামের মত ছোট গ্রামগুলোতে ভোটের ফলাফল বৃহত্তর জেলা ও জাতীয় স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে। নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করার জন্য নতুন প্রতিনিধি যদি কার্যকর নীতি প্রণয়ন করেন, তবে তা গ্রামবাসীর আস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে হিল ট্র্যাক্টসের স্থিতিশীলতা বাড়াবে। অন্যদিকে, যদি নিরাপত্তা সংক্রান্ত চাহিদা উপেক্ষা করা হয়, তবে তা আবার সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সংক্ষেপে, হংসামা গ্রামের চা দোকানে ওমনু মারমা এবং তার সহকর্মীরা নির্বাচনের মাধ্যমে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন। পারা দখলের ঘটনা ও চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টসের শান্তি চুক্তির অমীমাংসিত বিষয়গুলো এই চাহিদার পেছনে গভীর প্রেক্ষাপট গঠন করে। আসন্ন নির্বাচন কিভাবে এই চাহিদাগুলোকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপান্তর করবে, তা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে থাকবে।



