ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা তীব্রতর হওয়ায় ওমানের মাস্কটে পরোক্ষ আলোচনার সূচনা হয়েছে, তবে উভয় পক্ষের এজেন্ডা পার্থক্যের কারণে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। অঞ্চলীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্য ঐতিহাসিকভাবে অস্থির ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান-ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উত্তেজনা কূটনৈতিক চ্যানেল চালু থাকা সত্ত্বেও সামরিক প্রস্তুতি, হুমকি ও পাল্টা সতর্কবার্তার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যা ভুল হিসাবের ক্ষেত্রে পুরো অঞ্চলকে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করতে পারে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে যে তার পারমাণবিক উদ্যোগ কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই দাবিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে এবং এটিকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সম্ভাব্য পথ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। পারস্পরিক অবিশ্বাসের ফলে কূটনৈতিক সংলাপ বারংবার ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে।
ওমানের মাস্কটে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক প্রশ্নের পাশাপাশি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রক্সি রাজনীতির বিষয়গুলোকে আলোচনার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। ইরান এই দাবিগুলোকে সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আলোচনার পরিধি সংকুচিত হয়েছে।
ইরান একক রাষ্ট্রমাত্র নয়; লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ইত্যাদি দেশে তার প্রভাব বিস্তৃত। তাই ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ একাধিক ফ্রন্টে সংঘাতের বিস্তার ঘটাতে পারে। তেহরান ইতিমধ্যে সতর্ক করে যে তার ওপর আক্রমণ হলে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে, যা কেবল রাজনৈতিক অলংকার নয়, বাস্তব কৌশলগত সমীকরণের প্রতিফলন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সম্প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে; অতিরিক্ত বিমানবাহী রণতরী ও নৌবহর মোতায়েনের মাধ্যমে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো ইরানের নিরাপত্তা উদ্বেগকে তীব্র করে এবং সম্ভাব্য সংঘাতের পরিসরকে বিস্তৃত করে।
ইরানের সামরিক নেতৃত্ব প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে তাদের বাহিনী ‘ট্রিগারে আঙুল’ রাখে এবং প্রয়োজনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত। এই ধরনের ভাষা প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি ও আক্রমণাত্মক মানসিকতার সীমারেখা ধূসর করে, যা অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে অস্থির করে তুলতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক চাপ শাসকগোষ্ঠীর উপর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সরকারকে বাহ্যিক সংঘাতকে জাতীয় ঐক্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে প্ররোচিত করতে পারে।
একজন কূটনীতিকের মতে, “ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক বিষয়ের সমাধান না হলে আঞ্চলিক স্তরে বিস্তৃত সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়বে, এবং ওমানের মধ্যস্থতা বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমিত প্রভাব রাখতে পারে।” এই মন্তব্য বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে ওমানের মাধ্যমে নতুন আলোচনা রাউন্ডের পরিকল্পনা রয়েছে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নীতি পুনর্বিবেচনা এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের উপর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরানের আঞ্চলিক জোটের পুনর্গঠনও নজরে থাকবে।
ইউএন সিকিউরিটি কাউন্সিলের সম্ভাব্য বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক পর্যালোচনা মেকানিজমের সক্রিয়তা এই সংকটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে উভয় পক্ষের পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠনের ক্ষমতার ওপর।
সারসংক্ষেপে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বিরোধ, ওমানের মধ্যস্থতা, এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের সমন্বয় বর্তমান উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। কোনো ভুল হিসাবের ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে, তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ত্বরিত ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে।



