ইরানের তেল রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত আয়কে অস্থিতিশীল কার্যক্রম ও দেশীয় দমনকে সমর্থন করার অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তটি বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগটের মাধ্যমে জানানো হয়। নিষেধাজ্ঞা ইরানের অবৈধ তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর লক্ষ্য করে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত।
টমি পিগট উল্লেখ করেন, ইরানের তেল রপ্তানি থেকে অর্জিত তহবিল আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ দমনকে ত্বরান্বিত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি যুক্তি দেন, এই তহবিলের ব্যবহারকে সীমাবদ্ধ করা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য অপরিহার্য। পিগটের বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবৈধ তেল রপ্তানি কমাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা ইরানের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে তার কূটনৈতিক ও সামরিক আচরণে প্রভাব ফেলতে চায়। নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের তেল রপ্তানি চেইনে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিপিং কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ হবে। এই নীতি অনুসরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সেক্টরকে ইরানের তেল লেনদেনে জড়িত হওয়া থেকে বিরত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সপ্তাহে শুক্রবার ওমানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ শান্তি দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুজনের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়। বৈঠকের পর আরাঘচি পরিবেশকে ‘ইতিবাচক’ বলে উল্লেখ করেন এবং উভয় পক্ষের পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ার সম্ভাবনা প্রকাশ করেন।
বৈঠকের সময় ইরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা ও তেল রপ্তানি সংক্রান্ত যুক্তি-বিতর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাতের সমাধানের উপায়ও আলোচনা হয়। আরাঘচি জোর দিয়ে বলেন, ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহযোগিতা করে তার বৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। তবে তিনি যুক্তি দেন, নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মুখে ইরান তার কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে নতুন কৌশল অনুসন্ধান করবে।
বৈঠকের আগে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি জানিয়ে দেন এবং ইরানের উপকূলের নিকটবর্তী এলাকায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। এই ঘোষণা ইরানের নিরাপত্তা নীতি ও আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ইরানের কূটনৈতিক চাপে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকির সমন্বয় ইরানের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারে। ইরান তার তেল রপ্তানি চ্যানেলগুলো পুনর্গঠন করে বিকল্প বাজার ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আয় সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারে। একই সঙ্গে, ইরান পারমাণবিক আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও আর্থিক স্বস্তি পেতে চায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পরবর্তী ধাপ হিসেবে নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়ন ও তদারকি প্রক্রিয়া শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা একত্রে ইরানের তেল লেনদেনের উপর নজর রাখবে। পাশাপাশি, ওমানে অনুষ্ঠিত বৈঠকের ফলাফল অনুযায়ী পারমাণবিক আলোচনার নতুন রূপরেখা তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দিকনির্দেশনা এই দুই ধাপের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল হবে।
এই সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ইরানের তেল রপ্তানি ও পারমাণবিক নীতি উভয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের তেল রপ্তানির পরিমাণে কী পরিবর্তন আসবে এবং তা আঞ্চলিক নিরাপত্তায় কী প্রভাব ফেলবে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। শেষ পর্যন্ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি ইরানের কূটনৈতিক আচরণে কী পরিবর্তন আনবে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে।



