ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে অন্তত তিনটি আসনে বিএনপি প্রার্থীর জন্য কঠিন প্রতিযোগিতা দেখা দেবে। বিশ্লেষক ও স্থানীয় ভোটারদের মতে, রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী‑তানোর), রাজশাহী-৪ (বাগমারা) এবং রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া‑দুর্গাপুর) এই তিনটি আসনে দলীয় কোন্দল, ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী এবং জামায়াতের শক্ত অবস্থান মিলিতভাবে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা কমিয়ে দিচ্ছে।
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ও নয়টি উপজেলা সমন্বিত এই অঞ্চলে ২০০৮ সালের পুনর্গঠনের পর সংসদীয় আসনের সংখ্যা পাঁচ থেকে ছয়ে বৃদ্ধি পায়। অতীতের নির্বাচনী ফলাফল দেখায়, ১৯৯১ সালে এক আসনে আওয়ামী লীগ, একে জাতীয় পার্টি এবং তিনটি আসনে বিএনপি জিতেছিল। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সব ছয়টি আসনই বিএনপি দখল করলেও, ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত চারটি ধারাবাহিক নির্বাচনে সব আসনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। ১৯৮৬ সালের পূর্বে, পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটি জাতীয় পার্টি, একটি আওয়ামী লীগ এবং একটি জামায়াত‑এ‑ইসলামির প্রার্থী জিতেছিল।
রাজশাহী-১ আসনে বিএনপি প্রার্থীরূপে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শরীফ উদ্দীন নির্বাচিত হয়েছেন, যিনি দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টার পদে কাজ করেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন জামায়াত‑এ‑ইসলামির কেন্দ্রীয় নায়েক আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। শরীফ উদ্দীন, যদিও নতুন মুখ, তবু প্রয়াত মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ছোট ভাই হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ১৯৮৬ সালে একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বহুবার নির্বাচনী অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। উভয় প্রার্থীরই শক্তিশালী প্রোফাইলের কারণে এই আসনে তীব্র হাড্ডাহাড্ডি লড়াই প্রত্যাশিত।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ডি এম ডি জিয়াউর রহমান জিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী। তার বিপরীতে জামায়াত‑এ‑ইসলামির প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী সরদার নির্বাচিত হয়েছেন। জিয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, আর ডা. বারী সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিচিত, যা তার প্রচারকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। উভয় প্রার্থীরই এলাকার ভোটারদের কাছে স্বীকৃতি আছে, ফলে এই আসনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হতে পারে।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া‑দুর্গাপুর) আসনটি বিশ্লেষকদের মতে একই ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে। যদিও নির্দিষ্ট প্রার্থীর নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে দলীয় কোন্দল ও জামায়াতের শক্তিশালী উপস্থিতি এই আসনটিকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
জামায়াত‑এ‑ইসলামি ১৯৮৬ সালের পর থেকে কোনো জয় অর্জন করতে পারেনি, তবে ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশে চার দশক পর আবার সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছে। তাদের প্রচার ও গণসংযোগের দৃশ্যমানতা কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির তুলনায় বেশি হওয়ায় সাধারণ ভোটারদের দৃষ্টিতে তাদের প্রভাব বাড়ছে।
রাজশাহীর রাজনৈতিক দৃশ্যপট এখন দলীয় সংঘাত, ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী এবং জামায়াতের পুনরুত্থানের সমন্বয়ে গঠিত। বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন, যদি বিএনপি এই তিনটি আসনে জয়লাভ করতে না পারে, তবে তাদের সামগ্রিক পারফরম্যান্সে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। অন্যদিকে, জামায়াত‑এ‑ইসলামির শক্তিশালী প্রচার কৌশল ও সামাজিক কাজের মাধ্যমে তারা ভোটার ভিত্তি সম্প্রসারণে সচেষ্ট।
পরবর্তী ধাপে, উভয় দলই নির্বাচনী প্রচারকে তীব্র করে তুলবে, বিশেষ করে গরিব ও গ্রামীণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন সভা, র্যালি ও সামাজিক কর্মসূচি চালু করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফল রাজশাহীর রাজনৈতিক ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক গতিপথে প্রভাব ফেলবে।



