ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল বন্ধের আদেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় এইডসের বিরুদ্ধে লড়াইকে কঠিন করে তুলেছে। ১৩,০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দেশটি এখন আর্থিক ঘাটতির মুখোমুখি। এই পরিবর্তন স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রের বহু কর্মীর মধ্যে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, কারণ তারা সরাসরি তহবিলের ঘাটতি অনুভব করছে।
প্রশাসনিক আদেশটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের কয়েক ঘণ্টা পরই স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী তহবিলের নতুন বরাদ্দ স্থগিত করা হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতি বছর প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৯৫ মিলিয়ন পাউন্ড) তহবিলের সম্ভাব্য ক্ষতি হয়েছে। তহবিলের এই হ্রাস দেশের এইডস প্রোগ্রামের স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এই পরিমাণ দেশের এইডস প্রোগ্রামের মোট ব্যয়ের প্রায় এক পঞ্চমাংশের সমান, যা পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের তহবিলের মাধ্যমে পূরণ হতো। যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এখন এই সমর্থন না থাকলে সেবার গুণগত মান হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদেশের পরপরই দক্ষিণ আফ্রিকান সরকার নিজস্ব বাজেট থেকে ৪৬ মিলিয়ন ডলার সরবরাহ করে, যা হারানো তহবিলের মাত্র ১১.৫ শতাংশ। যদিও এই তহবিল কিছুটা শূন্যস্থান পূরণ করেছে, তবে মূল ঘাটতি এখনও রয়ে গেছে এবং অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহের চাপ বাড়ছে। সরকারকে এই ঘাটতি পূরণের জন্য নতুন তহবিলের উৎস খুঁজতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকার একটি অস্থায়ী “ব্রিজ প্ল্যান” ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে মার্চের শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত ১১৫ মিলিয়ন ডলার সরবরাহ করা হবে। এই তহবিলটি পূর্বের PEPFAR (President’s Emergency Fund for AIDS Relief) এর নিয়মিত অনুদানের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। তবে এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র অস্থায়ী, এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধান এখনো অনিশ্চিত।
২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের উদ্যোগে গড়ে ওঠা PEPFAR প্রোগ্রাম এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী HIV/AIDS মোকাবিলায় ১১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে এবং ২৬ মিলিয়ন জীবন রক্ষা করেছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ জানায়। এই বিশাল বিনিয়োগের বেশিরভাগই দক্ষিণ আফ্রিকায় কেন্দ্রীভূত, যেখানে রোগের বিস্তার সর্বোচ্চ।
দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ১৩ শতাংশ জনসংখ্যা HIV-এ আক্রান্ত, যা দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত জনগোষ্ঠীর অধিকারী করে তুলেছে। এই বৃহৎ রোগীর সংখ্যা দেশীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক তহবিলের ওপর নির্ভরতা বাড়ায়।
বছরের পর বছর চিকিৎসা ও প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও, এই সেবাগুলি ব্যয়বহুল। আর্ট (অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল থেরাপি) ও অন্যান্য ওষুধের দাম উচ্চ, এবং তহবিলের হ্রাসের ফলে রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সেবা সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে রোগের বিস্তার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডেসমন্ড টুটু হেলথ ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত HIV গবেষক প্রফেসর লিন্ডা-গেইল বেকার উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে টেস্টিং হারে উল্লেখযোগ্য হ্রাস এবং সেবার ফাঁক দেখা দিচ্ছে। তিনি জানান, টেস্টিং সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে, যা নতুন সংক্রমণ শনাক্ত করতে বাধা দেয়।
তার গবেষণা প্রকল্পের প্রায় চল্লিশ শতাংশ অর্থ, অর্থাৎ প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার থেকে আসে। এই তহবিলের অনুপস্থিতি সরাসরি শেষ-পর্যায়ের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে, বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকায় সেবা পৌঁছাতে। তাই তহবিলের ঘাটতি গবেষণা ও সেবার গুণগত মানকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
শেষ-পর্যায়ের কার্যক্রমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এমন রোগীদের সনাক্ত করা যারা স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রে আসেন না, এবং পাবলিক ক্লিনিকের দূরত্ব বা পরিবহন সমস্যার কারণে সেবা পেতে অক্ষমদের জন্য মোবাইল ইউনিট চালু করা। এসব কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল অপরিহার্য ছিল, এবং এখন এই সমর্থন না থাকলে সেবা বিস্তারে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
বর্তমান আর্থিক ঘাটতি দক্ষিণ আফ্রিকান সরকারকে বিকল্প তহবিলের সন্ধানে বাধ্য করছে, তবে আন্তর্জাতিক দাতাদের অবদান ত্বরান্বিত না হলে রোগীর সেবা ও প্রতিরোধমূলক প্রোগ্রামগুলোতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এই পরিস্থিতিতে তহবিলের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় সম্পদ বাড়ানোর জন্য নীতি নির্ধারকদের ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।



