চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে শুক্রবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় কবি ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার বন্দরকে গোপনে ইজারা দেওয়া গণস্বার্থের বিরোধী বলে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বন্দর সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জনসাধারণের জানাশোনার বাইরে রাখা, বিশেষ করে নন‑ডিসক্লোজার চুক্তির আড়ালে, স্বচ্ছতা ও গণসার্বভৌমত্বের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করে।
সভায় বন্দর সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক আহমেদ ফেরদৌসের উদ্বোধনী বক্তব্যের পর মজহার তার মতামত উপস্থাপন করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আমরা কি সত্যিই জনগণকে জানিয়ে, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারকে অন্তর্ভুক্ত করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি?” এবং নন‑ডিসক্লোজার ক্লজের ব্যবহারকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর হস্তান্তরের যুক্তি তিনি অদক্ষ ও বিপজ্জনক বলে সমালোচনা করেন, কারণ এতে বিদেশি সংস্থা মুনাফা অর্জন করবে, আর দেশের জরুরি সময়ে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সুযোগ কমে যাবে।
মজহার বন্দরকে দেশের অর্থনৈতিক, সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরেন। বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রাম বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই এর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছভাবে করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, শ্রমিকদের প্রতিবাদ যুক্তিসঙ্গত, তবে বন্দর বন্ধ হলে তা বিদেশি সংস্থার কাছে হস্তান্তরের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। তাই শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে গণসার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব।
বক্তব্যের মধ্যে মজহার গণসার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পার্থক্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংসদের সার্বভৌমত্বের অধীনে ক্ষমতা একতরফা নেওয়া হলে তা লুটের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনকালে জনগণকে নির্ধারণ করতে হয়, কে তাদের অধিকার লুট করবে। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্মী, আলোচক ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা। কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ রোমেল ‘চট্টগ্রাম বন্দর সুরক্ষা বনাম বন্দর অচলের রাজনীতি’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, যেখানে তিনি বন্দর বন্ধের রাজনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেন। এছাড়া চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমা উপস্থিত ছিলেন এবং আলোচনার সময় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মতামত প্রদান করেন।
বন্দরের কর্মবিরতি দুই দিন স্থগিত করা হয়েছে, যা ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। মজহার উল্লেখ করেন, এই বিরতি শ্রমিক আন্দোলনের স্বাভাবিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, তবে একই সঙ্গে এটি বন্দরকে বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা থেকে রোধ করতে পারে। তিনি সরকারকে আহ্বান জানান, স্বচ্ছ আলোচনার মাধ্যমে সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে বন্দরকে দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করা উচিত।
বন্দর সুরক্ষা কমিটি এই মতবিনিময়কে ‘চট্টগ্রাম বন্দর সুরক্ষা বনাম বন্দর অচলের রাজনীতি’ শিরোনামে আয়োজন করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য বন্দর সংক্রান্ত নীতি ও সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের মতামত সংগ্রহ করা। মজহার এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারীর মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, বন্দরকে গোপনে ইজারা দেওয়া না শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষতি করে, বরং দেশের সার্বভৌমত্বের মৌলিক নীতি ক্ষুণ্ণ করে। ভবিষ্যতে এই ধরনের সিদ্ধান্তে সংসদ ও জনমতকে অন্তর্ভুক্ত করা না হলে রাজনৈতিক বিরোধ ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।
এই আলোচনার পর সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনও অনিশ্চিত, তবে বন্দর সংক্রান্ত নীতি গঠনে স্বচ্ছতা, জনসচেতনতা ও গণসার্বভৌমত্বের গুরুত্ব পুনরায় জোরদার হয়েছে।



