কতিপয় বছর আগে জিন সম্পাদনা ও ওষুধ নকশার প্রযুক্তি উন্নত হলেও, বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার বিরল রোগ এখনও কোনো চিকিৎসা পায়নি। এই ঘাটতি দূর করতে মানবশক্তির অভাবকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইনসিলিকো মেডিসিনের সিইও অ্যালেক্স আলিপার। তিনি কাতার অনুষ্ঠিত ওয়েব সামিটে এআইকে শিল্পের শ্রম সংকটের সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করেন।
বায়োটেকনোলজি ক্ষেত্রের গবেষকরা জিন এডিটিং, প্রোটিন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কম্পিউটেশনাল ড্রাগ ডিজাইনের জন্য আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে। তবুও রোগের বৈচিত্র্য ও ডেটার বিশাল পরিমাণের কারণে বহু বিরল রোগে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতি সমাধানে দক্ষ বিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকের সংখ্যা অপর্যাপ্ত বলে ধরা হয়।
আলিপার ও তার দল দাবি করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন এমন একটি শক্তি বৃদ্ধি করার উপকরণ যা বিজ্ঞানীদের সীমিত মানবসম্পদে বৃহৎ সমস্যার মোকাবিলা করতে সক্ষম করে। এআই‑এর সাহায্যে ডেটা বিশ্লেষণ, টার্গেট শনাক্তকরণ এবং অণু ডিজাইন স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব, ফলে গবেষণার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
ইনসিলিকোর প্ল্যাটফর্ম জীববৈজ্ঞানিক, রাসায়নিক এবং ক্লিনিক্যাল তথ্য একত্রিত করে রোগের লক্ষ্যবস্তু ও সম্ভাব্য ওষুধের প্রার্থী সম্পর্কে অনুমান তৈরি করে। স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূর্বে শত শত রসায়নবিদ ও বায়োলজিস্টের কাজকে একসাথে সম্পন্ন করা যায়, ফলে ডিজাইন স্পেসের বিশাল পরিসর দ্রুত স্ক্যান করা সম্ভব হয়।
সম্প্রতি কোম্পানি ‘MMAI Gym’ নামে একটি উদ্যোগ চালু করেছে, যার লক্ষ্য হল চ্যাটজিপিটি ও জেমিনি মত সাধারণ বড় ভাষা মডেলকে বিশেষায়িত মডেলের মতো পারফরম্যান্সে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এই প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম মডেলকে বহু-মোডাল ও বহু-কার্যকরীভাবে কাজ করতে সক্ষম করে, যাতে একক সিস্টেমে বিভিন্ন ড্রাগ ডিসকভারি কাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করা যায়।
টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে আলিপার উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে একটি একক মাল্টি‑মোডাল মডেল মানবের তুলনায় অধিক নির্ভুলতা নিয়ে রোগের কারণ শনাক্ত, অণু স্ক্রিনিং এবং ক্লিনিক্যাল প্রেডিকশন একসঙ্গে করতে পারবে। এই ধরনের ‘ফার্মাসিউটিক্যাল সুপারইন্টেলিজেন্স’ শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে শ্রম ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, হাজার হাজার রোগের এখনও কোনো নিরাময় নেই, আর বিরল রোগগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। তাই বুদ্ধিমান সিস্টেমের মাধ্যমে গবেষণার গতি ত্বরান্বিত করা এবং মানবসম্পদের অভাব পূরণ করা জরুরি, যাতে রোগীর জন্য নতুন থেরাপি দ্রুত তৈরি করা যায়।
এআই‑এর স্বয়ংক্রিয়তা কাঁচা ডেটা থেকে হাই-ইফেক্টিভ থেরাপি প্রার্থী পর্যন্ত সময়কে মাস থেকে সপ্তাহে কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে ল্যাবরেটরি খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়, কারণ কম রিসোর্সে বৃহৎ সংখ্যক অণু স্ক্রিন করা সম্ভব হয়। ফলে ফার্মা কোম্পানিগুলো কম বাজেটে বেশি গবেষণা চালাতে পারে।
ইনসিলিকো সম্প্রতি এআই মডেল ব্যবহার করে বিদ্যমান ওষুধকে অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস (ALS) রোগে পুনঃপ্রয়োগের সম্ভাবনা পরীক্ষা করেছে। বিশ্লেষণ দেখায়, কিছু অনুমোদিত ওষুধ রোগের নিউরোডিজেনারেশন প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে, যা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য নতুন প্রার্থী সরবরাহ করে।
ড্রাগ আবিষ্কারের পরেও শ্রমের ঘাটতি শেষ হয় না; রোগের জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া বুঝে থেরাপি বিকাশে ক্লিনিক্যাল টেস্ট, রেজিস্ট্রেশন এবং রোগীর ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রয়োজন। এআই এই ধাপগুলোতেও ডেটা বিশ্লেষণ ও রোগীর রিস্ক স্কোরিং স্বয়ংক্রিয় করে সমর্থন দিতে পারে।
যদি এআই‑ভিত্তিক সিস্টেম ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়, তবে আগামী দশকে হাজার হাজার বিরল রোগের জন্য নতুন ওষুধের পথ উন্মুক্ত হতে পারে। শ্রম ঘাটতি কমে গবেষণার গতি বাড়লে রোগীর জীবনের মান উন্নত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা খরচও দীর্ঘমেয়াদে হ্রাস পাবে।



