রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র সীমা নির্ধারণকারী চুক্তি আজ শেষ হয়েছে, ফলে দুই সুপারপাওয়ারকে তাদের পারমাণবিক সঞ্চয় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ানোর সুযোগ মিলেছে। চুক্তির সমাপ্তি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশে তীব্র পরিবর্তন আনবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গতিবিধিতে।
এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই পারমাণবিক অস্ত্রাগার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা গ্লোবাল স্ট্রাটেজিক ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে। এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোতে প্রভাব ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, এবং বিশেষ করে ভারত এ জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারত এ বর্তমানে চীন ও পাকিস্তানসহ দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চীন বর্তমানে কমপক্ষে ৬০০টি পারমাণবিক অস্ত্র ধারণ করে এবং প্রতি বছর প্রায় ১০০টি নতুন ওয়ারহেড উৎপাদন করছে। বেইজিং আত্মরক্ষার দাবি রাখলেও, আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের অভাবে ভারত এ-এর নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ছে।
পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানও পারমাণবিক ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে; দেশটির হাতে প্রায় ১৭০টি ওয়ারহেড রয়েছে এবং তারা নতুন অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ মজুদ করছে। এই দুই প্রতিবেশীর ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ভারত এ-কে ন্যূনতম সুরক্ষা নীতি বজায় রাখার পাশাপাশি তার প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, চীনকে অন্তর্ভুক্ত না করলে তারা নতুন কোনো পারমাণবিক চুক্তিতে আগ্রহী নয়। তবে চীন বর্তমানে নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় অংশ নিতে অনিচ্ছুক, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। এই অচলাবস্থা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর পারমাণবিক কর্মসূচি ত্বরান্বিত করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্বের অন্যান্য সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটেও এই চুক্তির সমাপ্তি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের মধ্যে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক শান্তির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি, যেখানে বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সরাসরি আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে।
একজন কূটনীতিকের মতে, “রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক চুক্তি শেষ হওয়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি বড় পরিবর্তন, এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নীতিতে পুনর্গঠন আনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করবে।” একই সময়ে, একটি নিরাপত্তা বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “চীন ও পাকিস্তানের পারমাণবিক ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি ভারত এ-কে তার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা পুনরায় মূল্যায়ন করতে বাধ্য করবে।” এই মন্তব্যগুলো বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক চিত্রকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
পরবর্তী কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের দিকে থাকবে, পাশাপাশি চীন ও পাকিস্তানের পারমাণবিক উন্নয়নকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো নতুন কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যা ভবিষ্যতে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আলোচনার পুনরায় সূচনা করতে পারে।
এদিকে, ভারত এ সরকার ইতিমধ্যে তার পারমাণবিক নীতি ও কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছে। তবে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশের অস্থিরতা এবং পারমাণবিক প্রতিযোগিতার তীব্রতা বিবেচনা করে, দেশটির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক চুক্তি সমাপ্তি বিশ্ব নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নীতি, বিশেষত ভারত এ-র কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি, পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে নতুন কাঠামো গড়ে তোলার সময়।



