বিশ্বের বৃহত্তম দুইটি গণতন্ত্র, মার্কিন সরকার এবং ভারত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেতৃত্বের অগ্রাধিকার সমস্যার সমাধান থেকে বর্ণনা নিয়ন্ত্রণের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এই পরিবর্তন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী সমঝোতা ও নৈতিক নেতৃত্বের ধারণা ধীরে ধীরে পেছনে ধাক্কা খাচ্ছে।
পূর্বে নেতৃত্বের তত্ত্বে বলা হতো যে মহান নেতারা জনগণের সেবা করে, বিশ্বাস গড়ে তোলে এবং প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে। ঐ সময়ে টেকসই সাফল্যকে নৈতিক নেতৃত্ব এবং দৃঢ় সাংস্কৃতিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই ধারণা ধীরে ধীরে অপ্রচলিত হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ক্ষমতার সংগ্রাম এখন ঐক্যমত গড়ে তোলার চেয়ে ধ্রুবক বিভাজন ও ধ্রুবক বিরোধের মাধ্যমে শক্তিশালী হচ্ছে। বর্ণনা পুনর্লিখন, ঐতিহাসিক ঘটনা নির্বাচনমূলকভাবে স্মরণ এবং সামাজিক বিভাজন বাড়িয়ে কর্তৃত্বকে দৃঢ় করা হচ্ছে। এই প্রবণতা মার্কিন সরকার ও ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
ইতিহাসে মার্কিন সরকার এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে আব্রাহাম লিঙ্কন, বারাক ওবামা, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার প্যাটেলের মতো নেতারা নৈতিকতা ও জনসেবার ভিত্তিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের সময়ে নেতৃত্বের মূলমন্ত্র ছিল জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
এর বিপরীতে রাশিয়া, চীন এবং উত্তর কোরিয়ার মতো স্বৈরশাসনমূলক রাষ্ট্রগুলোতে নেতৃত্বের ধারণা জনগণের ওপর সরাসরি আধিপত্য নয়, বরং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অখণ্ডতা এবং প্রশ্নহীন আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে। এই দেশগুলোতে নেতৃত্বের পদ্ধতি স্বচ্ছতা বা জনমত বিবেচনা ছাড়াই কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ।
বেলজিয়ান, ইউক্রেন, ইরান, গ্রিনল্যান্ড এবং বাংলাদেশসহ ছোট দেশগুলোও আন্তর্জাতিক ক্ষমতা গেমের প্রভাবের অধীনে নিজেদের নীতি নির্ধারণে সীমাবদ্ধতা অনুভব করছে। এই দেশগুলোতে স্বতন্ত্র নীতি গঠন করার পরিবর্তে বৃহত্তর শক্তির রাজনৈতিক চালচলনে সাড়া দেওয়া বেশি দেখা যায়।
কর্পোরেট ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক কৌশলগুলো ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ব্যবহৃত বর্ণনা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি এখন বোর্ডরুমে দেখা যায়, যেখানে স্বচ্ছতার বদলে গোপনীয়তা ও আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কর্মীদের মধ্যে মতবিরোধকে অনুগত্যের পরীক্ষায় রূপান্তরিত করা হচ্ছে, ফলে ঝুঁকি গ্রহণের মনোভাব কমে এবং ভুল তথ্যের প্রকাশ বিলম্বিত হয়।
এই পরিবর্তনের ফলে সংস্থাগুলোতে অপ্রতুলতা ও গড়পড়তা কাজের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে সত্যের চেয়ে আনুগত্যকে বেশি মূল্যায়ন করা হয়। দলীয় সদস্যরা সমস্যার প্রাথমিক সংকেত শেয়ার করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে, ফলে ঝুঁকি বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য হুমকির মুখে পড়ে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনসাধারণের আস্থা হ্রাস পাবে এবং কর্পোরেট সেক্টরে উদ্ভাবন ও দায়িত্বশীলতা কমে যাবে। ভবিষ্যতে নেতৃত্বের মূল্যায়ন মানদণ্ডে বর্ণনা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে নৈতিকতা ও দক্ষতার ওপর পুনঃফোকাসের প্রয়োজন হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বর্তমান সময়ে নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা সমস্যার সমাধান থেকে বর্ণনা নিয়ন্ত্রণের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা রাজনৈতিক ও কর্পোরেট উভয় ক্ষেত্রেই নতুন চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করছে। এই প্রবণতা কীভাবে পরিবর্তিত হবে এবং কীভাবে পুনরায় নৈতিক নেতৃত্বের ভিত্তি গড়ে তোলা যাবে, তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার মূল বিষয় হয়ে থাকবে।



