উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে বুধবার সকালবেলা একটি নয় তলা ভবনের ছাদ থেকে তিন কিশোরী বোন আত্মহত্যা করে। ১৬ বছর বয়সী নিশিকা, ১৪ বছরী প্রাচী এবং ১২ বছরী পাখি একসাথে লাফিয়ে পড়ে, ফলে তিনজনই প্রাণ হারায়। পুলিশ জানায়, আত্মহত্যার আগে বোনেরা দীর্ঘ সময় মানসিক চাপের শিকার ছিলেন।
বিবাহিত স্টক ট্রেডার চেতন কুমার এই তিন কিশোরীর পিতা। তার দুই স্ত্রী পারস্পরিক বোন, প্রথম স্ত্রীর এক ছেলে ও এক মেয়ে, আর দ্বিতীয় স্ত্রীর তিন মেয়ে—ইহাই নিহত বোনরা। প্রথম বিবাহের প্রায় সতেরো বছর পর তিনি শ্যালিকাকে বিয়ে করেন।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা বহু বছর ধরে সংকটে ছিল। চেতন কুমারের ওপর প্রায় দুই কোটি রুপি ঋণ চাপ রয়েছে, যা তাকে ক্রমাগত উদ্বেগে রাখে। প্রথম স্ত্রীর ছেলে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা ভোগ করায় পরিবারের মানসিক ভার আরও বাড়ে। শেষ দুই বছর ধরে বোনদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়, ঋণের পরিমাণের কারণে আর্থিক সহায়তা না থাকায়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বোনরা কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। কে-ড্রামা, কে-পপ এবং অনলাইন গেমে তারা ব্যাপক সময় ব্যয় করতেন। সামাজিক মিডিয়ায় মারিয়া, আলিজা, সিন্ডি নামের কোরিয়ান পরিচয়ে তারা একাধিক অ্যাকাউন্ট চালাতেন, যেগুলোর অনুসারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল।
প্রায় দশ দিন আগে চেতন কুমার এই বিষয়গুলো জানার পর বোনদের অনলাইন অ্যাকাউন্ট মুছে দেন এবং মোবাইল ফোনগুলো নিজের হাতে নেন। তিনি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য ওই ফোনগুলো বিক্রি করতে হয়েছে। ফোন হারানোর পর বোনদের মানসিক অবস্থা আরও অবনতিতে যায়।
অধিকন্তু, পিতার তরফ থেকে দ্রুত বিয়ে করার হুমকি দেওয়া হয়। বোনরা দাবি করে, তারা কোরিয়ান, তাই ভারতীয় সমাজে বিয়ে করা সম্ভব নয়। এই কথোপকথনগুলো পরিবারের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হয়েছিল, বোনরা কোনো কাজ-ভিত্তিক কোরিয়ান গেমে অংশ নেয়, যার শেষ ধাপে আত্মহত্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে পরে পুলিশ স্পষ্ট করে জানায়, গেমের বিষয়টি বাস্তব নয়; কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও তা একমাত্র কারণ নয়।
ঘটনাস্থল থেকে আত্মহত্যা নোট এবং ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছে। নোটে লেখা আছে, “এই ডায়েরিতে যা কিছু লেখা আছে সব পড়ে নিন, কারণ সবই সত্য। এখনই পড়ো। আমি সত্যিই দুঃখিত। সরি পাপা।” নোটের শেষে একটি কান্নার ইমোজি আঁকা ছিল। ডায়েরির আট পাতায় আত্মহত্যার পূর্বে বোনদের মানসিক অবস্থা ও পারিবারিক সমস্যার উল্লেখ পাওয়া যায়।
পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং মামলাটি সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। চেতন কুমার ও তার দুই স্ত্রীর বিরুদ্ধে আর্থিক দায়, মানসিক নির্যাতন এবং সম্ভাব্য অপরাধমূলক কাজের জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। তদন্তের ফলাফল অনুযায়ী, পরিবারের অভ্যন্তরীণ চাপ, ঋণজনিত সমস্যার পাশাপাশি অনলাইন সংস্কৃতির অতিরিক্ত প্রভাবই আত্মহত্যার পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই ঘটনার পর স্থানীয় সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য ও তরুণদের অনলাইন আচরণ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা পরিবারিক আর্থিক সমস্যার সমাধান, মানসিক সহায়তা এবং তরুণদের ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহারে সঠিক দিকনির্দেশনার গুরুত্ব তুলে ধরছেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।



