পিরোজপুর জেলায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তৃতীয় সপ্তাহে, ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি, না যে দলীয় প্রতীক। এখানে দুইটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী – বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকধারী আলমগীর হোসেন এবং জামায়াত-এ-ইসলামির দাঁড়িপাল্লা প্রতীকধারী মাসুদ সাঈদী – সরাসরি মুখোমুখি হচ্ছেন। ভোটের ফলাফল স্থানীয় রাজনৈতিক গতিবিদ্যাকে পুনর্গঠন করতে পারে, বিশেষত সংখ্যালঘু ভোটার ও নীরব ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণে।
জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক সাধারণত ভোটারদের পছন্দের মূল নির্দেশক, তবে পিরোজপুরে এই প্রবণতা বদলে গেছে। বহু বছর ধরে ধান শীষ ও দাঁড়িপাল্লা চিহ্নের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সুনাম, পরিবারিক সংযোগ এবং স্থানীয় প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে। এই পরিবর্তন স্থানীয় সমাজের গঠন ও ভোটারদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া এবং অন্যান্য ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার দু’পাশে ধানক্ষেত, মাঝেমধ্যে ছোট বাজার এবং নদীর ধারে নৌকার সারি। এই দৃশ্যপটের মধ্যে ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনের চিত্র স্পষ্ট, যেখানে কৃষি, মৎস্য এবং স্থানীয় বাণিজ্যই প্রধান আয়ের উৎস। এমন পরিবেশে প্রার্থীর স্থানীয় সমস্যার সমাধান ক্ষমতা ভোটারদের কাছে বড় বিষয়।
পিরোজপুরের নির্বাচনী ইতিহাসে অতীতের বেশিরভাগ নির্বাচন সহিংসতা, আতঙ্ক এবং মানবিক ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০১০ পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচনে গুলিবর্ষণ, দলীয় সংঘর্ষ এবং ভোটার হিংসা ঘটেছে, যা এলাকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে।
তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বর্তমান পর্যায়ে পর্যন্ত কোনো বড় সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তিপূর্ণ প্রচারাভিযান এই পরিবর্তনের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ফলে ভোটাররা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পরিবেশে তাদের ভোট দিতে পারছেন।
স্থানীয় সমস্যাগুলোর মধ্যে নদীভাঙন ও পানীয় জলের সরবরাহের অবস্থা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পিরোজপুরের বহু গ্রাম নদীর ক্ষয় ও পানির ঘাটতির শিকার, যা ভোটারদের জীবনের সরাসরি প্রভাব ফেলে। প্রার্থীরা এই বিষয়গুলোকে নির্বাচনী এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন।
পিরোজপুর জেলায় তিনটি সংসদীয় আসন রয়েছে। পিরোজপুর-১ আসনে সদর উপজেলা, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানি অন্তর্ভুক্ত, যেখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩,৯২,১৭৮। পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া, কাউখালী, নেছারাবাদ) এর ভোটার সংখ্যা ৪,৯২,৮৮। পিরোজপুর-৩, যা মঠবাড়িয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত, সেখানে ভোটার সংখ্যা ২,৪১,৩৬১। এই সংখ্যা স্থানীয় ভোটার ভিত্তির আকারকে স্পষ্ট করে।
ইতিহাসিকভাবে এই তিনটি আসনে একক দলের চেয়ে একক ব্যক্তির আধিপত্য বেশি দেখা গেছে। প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং পারিবারিক প্রভাব ভোটের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দলীয় লোগোর চেয়ে প্রার্থীর পরিচয়ই ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে।
বর্তমান নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকধারী আলমগীর হোসেন এবং জামায়াত-এ-ইসলামির দাঁড়িপাল্লা প্রতীকধারী মাসুদ সাঈদী। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন থেকে এখন পর্যন্ত এই আসনে কখনো জামায়াত-এ-ইসলামি, আবার কখনো আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তবে বিএনপি অংশগ্রহণকারী নির্বাচনে ধানের শীষের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
এই নির্বাচন চক্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অতীতের দুইবার—১৯৯৬ ও ২০০১ সালে—দাঁড়িপাল্লা প্রতীকধারী প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, যা জামায়াত-এ-ইসলামির ঐতিহাসিক উপস্থিতি নির্দেশ করে।
ভবিষ্যতে পিরোজপুরের ভোটের ফলাফল স্থানীয় রাজনৈতিক গঠনে প্রভাব ফেলবে। যদি ধানের শীষের প্রার্থী জয়ী হন, তবে বিএনপির জেলায় প্রভাব বাড়বে, আর জামায়াত-এ-ইসলামির জয় স্থানীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে তার স্বীকৃতি শক্তিশালী করবে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয় ও স্থানীয় সমস্যার সমাধান ক্ষমতা ভোটারদের সিদ্ধান্তে মূল ভূমিকা রাখবে। নির্বাচনের পরবর্তী ধাপ হবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পার্লামেন্টে স্থানীয় চাহিদা উপস্থাপন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন।



