নয়া দিল্লি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনার পর্যায়ে পৌঁছানোর পর গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) গঠিত ছয়টি মধ্যপ্রাচ্যের দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই উদ্যোগটি বৈশ্বিক বাণিজ্য‑বিনিয়োগের ধীরগতি ও শুল্ক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতের কৌশলগত বাজার সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জিসিসি, যা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইনকে অন্তর্ভুক্ত করে, বর্তমানে ভারতের জন্য বৃহত্তম বাণিজ্য ব্লক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। জিসিসি সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে মোট বাণিজ্য পরিমাণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ‑পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের চেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিসিসি‑এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৭ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে সরকারি তথ্য জানায়।
এই পরিসরের মূল চালিকাশক্তি হল জ্বালানি আমদানি, যেখানে ভারত গালফ দেশগুলো থেকে তেল ও গ্যাসের বড় অংশ সংগ্রহ করে। রপ্তানির দিক থেকে রত্ন, ধাতু, ইলেকট্রনিক্স পণ্য এবং রাসায়নিক পণ্যগুলো প্রধান। জিসিসি‑এর সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের ফলে শুল্ক ও অ‑শুল্ক বাধা হ্রাস পাবে, যা ভারতীয় রপ্তানির প্রতিযোগিতা বাড়াবে এবং গালফের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ২০২২ সালের মে মাসে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ওমানের সঙ্গে নয়া দিল্লি পূর্বে একটি কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) করেছে, যা গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিগুলো ইতিমধ্যে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে এবং এফটিএ আলোচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
গালফের ছয়টি দেশের সঙ্গে এফটিএ প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে একাধিক ভারতীয় কর্মকর্তার নিশ্চিতকরণ পাওয়া গেছে। এফটিএ স্বাক্ষরের পর শুল্ক হ্রাসের পাশাপাশি পণ্য মানদণ্ড, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং সেবা খাতের প্রবেশাধিকারেও সুবিধা প্রদান করবে বলে আশা করা হচ্ছে। গালফ অঞ্চলে প্রায় এক কোটি ভারতীয় কর্মী ও পরিবার বসবাস করে, যা বাণিজ্যিক লেনদেনের মানবিক দিককে আরও শক্তিশালী করে।
বৃহস্পতিবার জিসিসি‑এর সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার সূচনা হয়। আলোচনার প্রথম ধাপে ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ (ToR) এ স্বাক্ষর করা হয়, যেখানে চুক্তির পরিসর, কাঠামো এবং সময়সূচি নির্ধারিত হয়। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীয়ুষ গয়াল এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং এফটিএ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এফটিএ স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভারত গালফের জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে এবং রপ্তানি পণ্যের জন্য নতুন বাজার উন্মুক্ত হবে। একই সঙ্গে, গালফ দেশগুলোকে ভারতের উচ্চমানের পণ্য ও সেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা যাবে, যা উভয় পক্ষের জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিত করবে।
প্রাথমিকভাবে টার্মস অব রেফারেন্সে নির্ধারিত বিষয়গুলোতে শুল্ক হারের ধাপে ধাপে হ্রাস, কাস্টমস প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়করণ এবং মানদণ্ডের পারস্পরিক স্বীকৃতি অন্তর্ভুক্ত। এই ধাপগুলো সম্পন্ন হলে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্য ২০২৬ সালের শেষের দিকে নির্ধারিত হয়েছে। তবে চূড়ান্ত শর্তাবলীর আলোচনার সময়সূচি ও রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীলতা রয়ে গেছে।
সারসংক্ষেপে, গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের ছয়টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আলোচনা ভারতের বাণিজ্যিক কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। শুল্ক ও অ‑শুল্ক বাধা হ্রাসের মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গালফের বৃহৎ ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ শক্তিশালীকরণ এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। এফটিএ স্বাক্ষরের পর ভারত গালফ অঞ্চলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন দিক উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।



