মেঘালয়ের ইস্ট জৈন্তিয়া হিলসির থাংসু গ্রামে বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় দশটায় একটি অবৈধ কয়লা খনিতে বিস্ফোরণ ঘটায় অন্তত অর্ধেকশত লোকের প্রাণহানি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জানামতে ১৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু এবং ৮ জনের আঘাত নিশ্চিত হয়েছে।
বিস্ফোরণের সময় খনিতে কতজন কাজ করছিলেন তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়নি, কারণ ঐ অঞ্চলে কাজের সংখ্যা প্রায়ই পরিবর্তনশীল এবং রেকর্ডের অভাব রয়েছে। তবে জানা যায়, অনেক শ্রমিক টানেলের গভীরে কাজ করছিলেন, ফলে বিস্ফোরণের পর তাদের বেশিরভাগই ভিতরে আটকে থাকার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
দুর্গম ভূখণ্ড এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধারযন্ত্রের অভাবে স্থানীয় পুলিশ অফিসার মনীশ কুমার সন্ধ্যায় উদ্ধারকর্ম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানান, রাতের অন্ধকারে এবং সরু, অগভীর টানেলগুলোতে কাজ করা যন্ত্রপাতি না থাকলে নিরাপদে উদ্ধার করা কঠিন।
পরের দিন, শুক্রবারের সকাল থেকে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় উদ্ধার দলগুলো পুনরায় অনুসন্ধান শুরু করে। দলগুলোতে বিশেষায়িত ড্রিল, শ্বাসযন্ত্র এবং রেসকিউ কুকুরসহ আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে, যা আটকে থাকা শ্রমিকদের সন্ধানে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই খনিটিকে ‘অবৈধ র্যাট-হোল খনি’ বলা হয়, যেখানে সরু ও গভীর টানেল গড়ে তোলা হয় এবং শ্রমিকরা ঝুঁকি স্বীকার করে কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সংগ্রহ করে। এই ধরনের খনিতে নিরাপত্তা মানদণ্ড প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়, ফলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ে।
খানির প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা বিকাশ কুমার প্রাথমিকভাবে ডাইনামাইটের ব্যবহারকে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, তবে তদন্ত চলমান থাকায় চূড়ান্ত কারণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তিনি জানান, বিস্ফোরণের ফলে ধোঁয়া, বিষাক্ত গ্যাস বা তাপের প্রভাবে শ্রমিকদের শ্বাসকষ্ট বা দগ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিকাশ কুমার আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি যে কতজন শ্রমিক এখনও টানেলের মধ্যে আটকে আছে। তাই সঠিক সংখ্যার অনুমান করা কঠিন, এবং উদ্ধারকাজের অগ্রগতি নির্ভর করবে টানেলের গঠন ও অবশিষ্ট গ্যাসের মাত্রার ওপর।
মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কংরাড সাংমা ঘটনাটিকে অবৈধ খনন বন্ধের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই ধরনের দুর্ঘটনা আর না ঘটার জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে প্রত্যেক প্রভাবিত পরিবারকে দুই লক্ষ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেন। এই অর্থপ্রদানটি তৎক্ষণাৎ প্রদান করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলে অনুমোদনহীন র্যাট-হোল খনির সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এই খনিগুলোতে কাজ করা শ্রমিকরা সাধারণত দৈনিক ১৮ থেকে ২৪ ডলার উপার্জন করে, যা তাদের জন্য একমাত্র আয়ের উৎস। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় তাদের জীবন ঝুঁকিতে থাকে।
২০১৮ সালে মেঘালয়ের একই অঞ্চলে একটি অনুরূপ র্যাট-হোল খনিতে বিস্ফোরণ ঘটায় ১৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার পরেও অবৈধ খনন কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়নি, যা আবারও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে।
রাজ্য সরকার ২০১৪ সাল থেকে র্যাট-হোল খনিতে কাজ নিষিদ্ধ করেছে, মূলত পানির দূষণ ও পরিবেশগত ক্ষতির উদ্বেগের কারণে। তবে নিয়মের লঙ্ঘন অব্যাহত থাকায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে কঠোর পর্যবেক্ষণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



