জামায়াত-এ-ইসলামি সম্প্রতি ৩৬ পৃষ্ঠার নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছে, যেখানে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য বিস্তৃত পরিকল্পনা ও লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ম্যানিফেস্টোটি প্রায় ১৪,০০০ শব্দে গঠিত এবং আসন্ন নির্বাচনের জন্য পার্টির নীতি ও কর্মসূচি তুলে ধরেছে।
দলটির এই নথিতে ট্রাফিক নিয়ম থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতির রূপান্তর পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা শহরে রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রাকের চলাচল অনুমোদনের পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে, যা শহরের ট্রাফিক জ্যাম কমাতে লক্ষ্যবদ্ধ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জামায়াত-এ-ইসলামি ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের মোট জিডিপি চার গুণ বৃদ্ধি করে ২ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তর করার লক্ষ্য স্থির করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ৭% বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, যা বর্তমান প্রবণতা অনুসারে প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাবে। তবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ১৫ বছরের মধ্যে ২ ট্রিলিয়ন ডলার অর্জনের জন্য দ্বি-অঙ্কের বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রয়োজন।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ বিলিয়ন ডলারে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, পার্টি ১০,০০০ টাকার ঋণ ১,০০,০০০ মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রদান করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়তা করবে বলে দাবি করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে বাজেটকে পর্যায়ক্রমে তিনগুণ বাড়ানোর কথা ম্যানিফেস্টোতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও বাজেটের নির্দিষ্ট বরাদ্দ বা বাস্তবায়ন কৌশল উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে, শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, তবে এসবের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের উৎস বা সময়সূচি স্পষ্ট নয়।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে জামায়াত-এ-ইসলামি ২০৩০ সালের মধ্যে আইসিটি (আইটি ও যোগাযোগ) খাতে দুই মিলিয়ন নতুন চাকরি, সরকারী উদ্যোগের মাধ্যমে আরও পাঁচ মিলিয়ন চাকরি এবং বেসরকারি খাতে পাঁচশো আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ গড়ে তোলার লক্ষ্য স্থির করেছে। এছাড়া, রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ৫ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারে পার্টি ১.৫ মিলিয়ন ফ্রিল্যান্সারকে উপজেলা স্তরে ই-হাবের মাধ্যমে সমর্থন করার পরিকল্পনা করেছে এবং অতিরিক্ত পাঁচ লক্ষ নতুন ই-উদ্যোগের সূচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই উদ্যোগগুলো গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে লক্ষ্যবদ্ধ।
তবে ম্যানিফেস্টোতে অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবেলা বা আয় বৈষম্য কমানোর জন্য কোনো স্পষ্ট নীতি উল্লেখ করা হয়নি। সমালোচকরা উল্লেখ করেন, উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য সত্ত্বেও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, তহবিলের উৎস ও সময়সীমা সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা অনুপস্থিত, যা লক্ষ্যগুলোর বাস্তবিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিশাল ম্যানিফেস্টো জামায়াত-এ-ইসলামির ভোটার ভিত্তি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য বহন করে। তবে প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে পার্টির সমর্থক ও বিরোধী উভয় পক্ষই সতর্কতা প্রকাশ করেছে। আসন্ন নির্বাচনে এই নথির প্রভাব কতটুকু হবে তা সময়ই নির্ধারণ করবে, তবে স্পষ্ট যে পার্টি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো পরিবর্তনের জন্য উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে।



