২ ফেব্রুয়ারি, সুদানের দক্ষিণ কুর্দোফান রাজ্যের আল‑কুয়েইক সামরিক হাসপাতালে দ্রুত সহায়তা বাহিনী পরিচালিত বোমা হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে চারজন চিকিৎসা কর্মী অন্তর্ভুক্ত। একই ঘটনার ফলে আটজন অতিরিক্ত আহত হয়েছেন।
হামলাটি দ্রুত সহায়তা বাহিনীর আধাসামরিক ইউনিটের দ্বারা চালিত এক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বোমা ব্যবহার করে করা হয় বলে জানানো হয়েছে। লক্ষ্যবস্তু ছিল হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টরসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মী, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মৃত্যুজনিত তালিকায় মেডিকেল ডিরেক্টর এবং তিনজন অতিরিক্ত স্বাস্থ্যকর্মীর নাম অন্তর্ভুক্ত, যা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের ওপর সরাসরি আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে। আহতদের মধ্যে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত আটজনকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তাত্ক্ষণিক সেবা প্রদান করা হয়েছে।
সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্কের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই হামলা একটি যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও বেসামরিক নাগরিক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা সংক্রান্ত কনভেনশনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। নেটওয়ার্কের মতে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে করা কোনো আক্রমণ আন্তর্জাতিক নীতিমালার বিরোধী।
এ পর্যন্ত দ্রুত সহায়তা বাহিনীর পক্ষ থেকে এই ঘটনার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি, যা পরিস্থিতির জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
দক্ষিণ কুর্দোফান জুড়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ধারাবাহিকভাবে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলিতে আক্রমণ চালানো হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা ফলে বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে, যা ইতিমধ্যে বিদ্যমান মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
হাসপাতালের অচলাবস্থা সাধারণ জনগণের জন্য মৌলিক চিকিৎসা সেবার প্রবেশাধিকারকে সীমিত করে, ফলে রোগের বিস্তার ও মৃত্যুর হার বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে এই অঞ্চলে জরুরি চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
আনাদোলু এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, সুদানের ১৮টি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের দারফুরের বেশিরভাগ অংশ দ্রুত সহায়তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আর উত্তর দারফুরের কিছু অংশ এখনও সুদানি সেনাবাহিনীর হাতে। দেশের দক্ষিণ, উত্তর, পূর্ব ও মধ্যাঞ্চল ও রাজধানী খার্তুমের অধিকাংশ এলাকা সুদানি সেনাবাহিনীর দখলে।
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদানি সেনাবাহিনী ও দ্রুত সহায়তা বাহিনীর মধ্যে সংঘাতের সূচনা থেকে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে। এই বৃহৎ মানবিক সংকটের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর ধ্বংসজনিত প্রভাব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি দ্রুত সহায়তা বাহিনীর এই ধরনের আক্রমণকে নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের কঠোর প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। আফ্রিকান ইউনিয়নও সুদানের শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও অবিলম্বে হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, হাসপাতালকে লক্ষ্য করে করা এই আক্রমণ শান্তি আলোচনার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে এবং সংঘাতের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা বাড়াবে। তিনি আরও বলেন, যদি দ্রুত সহায়তা বাহিনী এই ধরনের আক্রমণ চালিয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সুদানের পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হতে পারে, যেখানে মানবিক সহায়তা প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওপর পুনরাবৃত্তি আক্রমণ বন্ধ করার জন্য রেজোলিউশন প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে, আফ্রিকান ইউনিয়ন ও আরব লীগকে সমন্বিতভাবে মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর জন্য সমন্বয় বাড়াতে বলা হয়েছে।
সারসংক্ষেপে, আল‑কুয়েইক হাসপাতালের বোমা হামলা কেবল একক ঘটনা নয়, বরং সুদানের বিস্তৃত সংঘাতে স্বাস্থ্যসেবার ওপর লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণের ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ত্বরিত হস্তক্ষেপ এবং মানবিক আইনের কঠোর প্রয়োগই এই ধরণের যুদ্ধাপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে মূল চাবিকাঠি হবে।



