প্রখ্যাত বাউল গায়ক সুনীল কর্মকার ৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবারের ভোরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যায় শেষ শ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি দীর্ঘদিনের রোগের চিকিৎসা চলাকালীন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। তার অকাল প্রয়াণ বাউল সমাজে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
বাউল শিল্পী মুক্তা সরকার ফেসবুকে শোক প্রকাশ করে সুনীলকে “সুনীল কাকা” বলে সম্বোধন করেন এবং তার সুর শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিজের উপস্থিতি অনুভব করার কথা উল্লেখ করেন। তিনি সুনীলের মাতৃসুলভ ডাক, পালাগানের মঞ্চে ভাগ করা স্মৃতিগুলোকে স্মরণ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এই প্রকাশনা বাউল গোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু ভক্তের হৃদয়ে শোকের সুর জাগিয়ে তোলে।
সুনীল কর্মকারের সঙ্গীত যাত্রা সাত বছর বয়স থেকেই শুরু হয়। ছোটবেলায় তিনি গানের সঙ্গে পরিচিত হন এবং দ্রুতই তার স্বর ও রিদমে মুগ্ধ হয়ে বাউল গানের ধারায় প্রবেশ করেন। তার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গৃহস্থালির সরল পরিবেশে হলেও, সুরের প্রতি তার অনন্য আকর্ষণ তাকে দ্রুতই স্থানীয় মঞ্চে জনপ্রিয় করে তোলে।
বাউল গায়কের পাশাপাশি সুনীল একাধিক বাদ্যযন্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। বেহালা, দোতারা, তবলা ও হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন যন্ত্রে তিনি পারদর্শী ছিলেন, যা তার পারফরম্যান্সকে সমৃদ্ধ ও বহুমুখী করে তুলেছিল। এই বহুমুখিতা তার গানের সঙ্গে সঙ্গীতের সমন্বয়কে স্বতন্ত্র রঙ দেয় এবং শ्रोतাদের মুগ্ধ করে।
বাউল জগতের অন্যতম মশাল, ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর গান শোনার পরই সুনীলের গানের প্রতি আগ্রহ আরও তীব্র হয়। খাঁর সুরে মুগ্ধ হয়ে তিনি বাউল গানের গভীরতা ও আধ্যাত্মিকতা অনুধাবন করেন এবং নিজেকে এই ধারার অংশ হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবেই তিনি বাউল সঙ্গীতের ঐতিহ্যবাহী রূপে নিজস্ব স্বকীয়তা যুক্ত করে গড়ে তোলেন।
সুনীলের গানের তালিকায় বহু জনপ্রিয় রচনা রয়েছে, যা বাউল সমাবেশে ও রেডিওতে ঘন ঘন শোনা যায়। তার স্বরলিপি ও গীতিকবিতা বাউল সংস্কৃতির মাধুর্যকে আধুনিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেয়। তিনি যে গানগুলো গেয়েছেন, সেগুলো প্রায়শই মানবিক মূল্যবোধ, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ ও আত্মিক অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু নিয়ে গঠিত।
গায়কের পাশাপাশি তিনি একজন সক্রিয় গীতিকর্তা ছিলেন। নিজের রচনায় তিনি প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি নতুন গান সংযোজন করেছেন, যা বাউল গানের ভাণ্ডারে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে। তার রচনাশৈলী ঐতিহ্যবাহী বাউল গানের কাঠামোকে আধুনিক ছোঁয়া দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে এবং নতুন প্রজন্মের বাউল শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়েছে।
বাউল সমাজে সুনীল কর্মকারকে শুধু গায়ক নয়, বরং সংস্কৃতির রক্ষক হিসেবে গণ্য করা হয়। তার সুরে বাঙালির গ্রামীণ জীবনের রঙ, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের গভীরতা ও মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্মতা ফুটে ওঠে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে বাউল ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
তার অকাল প্রয়াণের পর বাউল সমাবেশে তার স্মৃতিকে সম্মান জানাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করা হয়েছে। সমবয়সী ও শিষ্যরা তার সুরের পুনরাবৃত্তি করে তার অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে এবং ভবিষ্যৎ বাউল গায়কদের জন্য তার পথপ্রদর্শক দৃষ্টান্ত বজায় রাখবে।
সুনীল কর্মকারের মৃত্যু বাউল জগতের জন্য এক বড় ক্ষতি, তবে তার সুর ও রচনাগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জীবন্ত থাকবে। তার গানের মাধ্যমে বাউল সংস্কৃতির মূলমন্ত্র—প্রেম, মানবতা ও প্রকৃতির সঙ্গে সাদৃশ্য—চিরকাল বজায় থাকবে।
বাউল শিল্পের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়ের পর, তার পরিবার ও ভক্তদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে, বাউল সমাজের সকল সদস্যকে তার স্মৃতিকে সম্মান জানাতে এবং তার সুরকে জীবিত রাখতে আহ্বান জানানো হচ্ছে।



