বিএনপি সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আল জাজিরার সঙ্গে কথোপকথনে জানিয়েছেন, দলটির মূল লক্ষ্য ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, বরং সব ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে ‘সেক্যুলারিজম’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই বক্তব্যের পটভূমিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং দলীয় নীতির পুনর্বিবেচনা রয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জোর দিয়ে বলেন, ১৯৭৭ সালে দলীয় প্রতিষ্ঠাতা আনিসুর রহমান জিকো যখন সংবিধান থেকে ‘সেক্যুলারিজম’ বাদ দেন, তখনই তা দলের সময়ের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করেছিল। তিনি যুক্তি দেন, সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষা করা, যা আজও দলটির নীতিতে প্রতিফলিত। তদুপরি, তিনি বলেন, ঐ সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জনমতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই পরিবর্তনটি করা হয়েছিল।
বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭২ সালের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত সেক্যুলারিজম নীতি থেকে ১৯৭৭ সালে তা প্রত্যাহার করে, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উল্লেখ করেন, সেই সময়ের সিদ্ধান্তটি দলীয় দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং এখনো তার প্রভাব রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সেক্যুলারিজমের পরিবর্তে ধর্মীয় সমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা দলীয় নীতির মূল ভিত্তি।
দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সকল ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হল মূল নীতি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই নীতি অনুসারে সরকারী নীতি ও আইন প্রণয়নে ধর্মীয় বৈষম্য না থাকা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, ‘সেক্যুলারিজম’ শব্দটি বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই নয়, তাই দলটি সমান ধর্মীয় অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়।
বিএনপি চেয়ারপার্সন তরিকি রহমানের নেতৃত্বে দলকে তিনি সর্বোচ্চ সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন, যদি দলটি নির্বাচনে জয়লাভ করে। তরিকি সম্পর্কে তিনি যে কোনো পারিবারিক স্বার্থ বা দুর্নীতির অভিযোগকে অপ্রমাণিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে খণ্ডন করেন। তরিকির বিরুদ্ধে দায়ের ৮০টিরও বেশি মামলা তিনি ‘রাজনৈতিকভাবে প্ররোচিত’ এবং পূর্বের শাসনকালে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় বাতিল হওয়া দাবি করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অতীতের শাসনকে ‘ফ্যাসিস্ট শাসন’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ওই শাসনকাল ১৫ বছর ধরে তরিকি বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, মামলাগুলো কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ানোর জন্য দায়ের করা হয়েছে। ফলে, তিনি তরিকির ওপর আরোপিত সব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে বিবেচনা করেন।
আসন্ন নির্বাচনের প্রসঙ্গে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রশ্নের উত্তর দেন যে, যদি কোনো রাজনৈতিক দল বা তার নেতা দুই হাজারের বেশি ছাত্র ও প্রতিবাদকারীর মৃত্যু ঘটায়, তবে তা বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের ঘটনায় আওয়ামী লীগ এবং তার বহু মন্ত্রী ও পার্টি সদস্যের ভূমিকা ছিল, যা এখনো তদন্তের বিষয়। তিনি বলেন, এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা দরকার, না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া, তিনি এই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক প্ররোচনা বলে উল্লেখ করেন।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা তার নিজের নীতি বিরোধী। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যক্তিগতভাবে আওয়ামী লীগ বা জামাত‑ই‑ইসলামি নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা প্রকাশ করেন। তিনি যুক্তি দেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক, তবে দলীয় কার্যক্রমে আইনের শাসন বজায় রাখা জরুরি, আর নিষেধাজ্ঞা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই মন্তব্যগুলো নির্বাচনের আগে বিএনপি কীভাবে নিজেকে পুনর্গঠন করছে এবং ধর্মীয় সমতা ভিত্তিক নীতি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে তা স্পষ্ট করে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভোটাররা দলটির সমান অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। ভবিষ্যতে দলটি যদি এই নীতিগুলোকে কার্যকর করে, তবে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন ভারসাম্য গড়ে উঠতে পারে।



