তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতে রূপান্তর না হওয়ার জন্য টার্কি সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। এই মন্তব্যটি ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, মিশর সফর শেষ করে দেশে ফেরার পথে তার বিমান থেকে করা হয়। তিনি টার্কির কূটনৈতিক ভূমিকা ও সম্ভাব্য সমঝোতার পথ তুলে ধরেছেন।
বক্তব্যের পটভূমিতে রয়েছে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, যা ওয়াশিংটন পারমাণবিক আলোচনার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। ইরানের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র পারমাণবিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে, ফলে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে। এই পারস্পরিক অমিল উভয় পক্ষকে পারস্পরিক বিমান হামলার হুমকি দিতে বাধ্য করেছে, যা পুরো অঞ্চলে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
এরদোয়ান এই বক্তব্যটি প্রেসিডেন্ট দপ্তরের লিখিত বিবৃতিতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ওমানের নিম্নপর্যায়ের বৈঠক শুক্রবার অনুষ্ঠিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি সাক্ষাৎ সম্ভব হলে তা উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হবে। এমন একটি শীর্ষমিটিং টার্কি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার ভূমিকা শক্তিশালী করবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।
এরদোয়ান আরও জানিয়েছেন, টার্কি এই ধরনের উচ্চস্তরের আলোচনাকে সহজতর করার জন্য সব কূটনৈতিক উপায় ব্যবহার করবে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ না হওয়ার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করবে। টার্কি পূর্বে সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন সংঘাত সমাধানে মধ্যস্থতা করেছে, যা তার অভিজ্ঞতা ও প্রভাবকে তুলে ধরে।
প্রেসিডেন্টের মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই ব্যক্তিগত বন্ধন দ্বিপাক্ষিক সংলাপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। তদুপরি, টার্কি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তার কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত করেছে, যা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকেও পারমাণবিক আলোচনার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, কারণ তারা বিশ্বাস করে যে ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক ক্ষমতার মধ্যে সংযোগ রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র পারমাণবিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার দৃঢ় অবস্থান বজায় রয়েছে এবং তারা ক্ষেপণাস্ত্র বিষয়কে আলাদা রাখতে চায়। এই পারস্পরিক অবস্থান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার অগ্রগতি কঠিন করে তুলছে।
উভয় দেশের পারস্পরিক হুমকি ও রেটরিকের ফলে গালফ অঞ্চলের দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা সতর্ক করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তেহরান তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এই সম্ভাবনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশকে অস্থির করে তুলতে পারে।
বিশেষ করে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের সদস্য দেশগুলো ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। এই পরিস্থিতি টার্কির মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ওমানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বৈঠকের বিষয়বস্তু ও পরিধি নিয়ে এখনও মতবিরোধ রয়েছে, ফলে শীর্ষমিটিংয়ের বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেন, উভয় পক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র বিষয়ের ওপর সমঝোতা না হলে কোনো সরাসরি সাক্ষাৎ কঠিন হতে পারে। তবে যদি উভয় দেশই কিছুটা নমনীয়তা দেখায়, তবে ধীরে ধীরে অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে।
এরদোয়ানের মন্তব্যে টার্কির কূটনৈতিক স্বার্থও স্পষ্ট হয়েছে। দক্ষিণে সিরিয়া ও ইরাকের সংঘাত, উত্তরে গ্রীসের সঙ্গে জোট, এবং গালফ অঞ্চলে বাণিজ্যিক স্বার্থ টার্কির জন্য স্থিতিশীল পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধান টার্কির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি জানিয়েছে, যা যদি বাস্তবায়িত হয় তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। যদিও এখনো কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়নি, তবে এই সতর্কতা টার্কির কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করেছে।
পর্যবেক্ষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শীর্ষমিটিংয়ের মাধ্যমে পারস্পরিক উদ্বেগ কমাতে সক্ষম হয়, তবে টার্কি এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে উভয় দেশের দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি বিবেচনা করলে অগ্রগতি ধীর ও ধাপে ধাপে হতে পারে। ভবিষ্যতে টার্কির ভূমিকা, ওমানের বৈঠকের ফলাফল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির পরিবর্তনই নির্ধারণ করবে যে এই উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত কীভাবে সমাধান হবে।



