চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে শ্রমিকদের প্রতিবাদে যুক্ত হয়ে আলোচনা শেষ করে ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন একটি প্রেস ব্রিফিং পরিচালনা করেন। তিনি স্পষ্ট করে বললেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) লিজ চুক্তি বাধা দেওয়া সম্ভব নয়, তবে চুক্তির শর্তাবলী ও স্তর নির্ধারণে সরকারী দৃষ্টিভঙ্গি এখনও গঠিত হচ্ছে।
উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, শ্রমিকদের দাবিগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে এবং যদি কর্মীসমাজ আগামীকাল সকাল থেকে কাজ না করে এবং যারা কাজ করতে ইচ্ছুক তাদের বাধা দেয়, তবে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। তিনি রমজান মাসের আগমনকে উল্লেখ করে বলেন, পোর্টে রমজানের সময় প্রচুর পণ্য প্রবাহিত হয়; এই সময়ে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা শ্রমিকদের উপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি করবে।
শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলাপের সময় হোসেন জানান, তিনি তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে সরকার কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করবে না যা দেশের স্বার্থের বিরোধী। তিনি যোগ করেন, যদি শ্রমিক নেতারা সন্তুষ্ট না হন, তবে তাদের অন্য কোনো এজেন্ডা থাকতে পারে।
এনসিটি লিজ চুক্তি বর্তমানে উচ্চ আদালতে চলমান একটি মামলার অধীন, যেখানে আদালত এখনো চূড়ান্ত রায় দেননি। হোসেন জোর দিয়ে বলেন, আদালত যদি চুক্তি নিষিদ্ধ করে, তবে সরকার আদালতের আদেশের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না।
চুক্তি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও তাড়াহুড়োর অভাবের দিক থেকে উপদেষ্টা আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, গত ছয় মাসে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিরা নিয়মিতভাবে বন্দরে উপস্থিত ছিলেন এবং গত তিন মাসে নেগোসিয়েশন চালু রয়েছে; তাই কোনো তাড়াহুড়া বা অস্বচ্ছতা নেই।
শ্রমিকদের প্রতিবাদে হোসেনের গাড়ি প্রায় বিশ মিনিটের জন্য গতি হারায়, কারণ কর্মীরা তার গাড়ি থামিয়ে রাখে। পরে তিনি বন্দর ভবনে ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং শ্রমিকদের দুইজন প্রতিনিধিকে চট্টগ্রাম বোট ক্লাবে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তবে শ্রমিকরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তারা ভবনের বাইরে বসে আলোচনা করতে অস্বীকার করে।
বাজার বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করছেন। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে লিজ চুক্তি সম্পন্ন হলে নিউমুরিং টার্মিনাল আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদান করতে সক্ষম হবে, যা পণ্যের গতি বৃদ্ধি, লোডিং-আনলোডিং সময় কমানো এবং বন্দর ব্যবহারিকতার উন্নতি ঘটাবে।
অন্যদিকে, শ্রমিকদের বিরোধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে পোর্টের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, যা রমজান মাসে পণ্যের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করবে। এই সময়ে দেশীয় ও রপ্তানি-আমদানি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত খরচ ও সময়সীমা হ্রাসের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হলে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়বে এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে শক্তিশালী করবে। তবে চুক্তি যদি আদালতের রায়ের পরেও অগ্রসর হয়, তবে সরকারকে শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাণিজ্যিক ক্ষতি কমে।
উপদেষ্টা হোসেনের মতে, সরকার দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করবে না যা ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিনি যতদিন পর্যন্ত দায়িত্বে আছেন, এমন কোনো চুক্তি অনুমোদন করবেন না যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অনুকূল নয়।
শ্রমিক আন্দোলনের মূল দাবি ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির শর্তাবলী এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার গতি এবং আদালতের রায়ের ফলাফল বন্দর কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণ করবে।
বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যৎ প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করছেন, যদি চুক্তি স্বচ্ছতা ও শ্রমিকদের স্বার্থের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্পন্ন হয়, তবে চট্টগ্রাম বন্দর আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক বিরোধ ও আদালতের অনিশ্চয়তা বন্দরকে অস্থির অবস্থায় রাখতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে লিজ চুক্তি থামানো কঠিন হলেও, চুক্তির শর্ত, আদালতের রায় এবং শ্রমিকদের সমঝোতা বন্দর ব্যবসার স্থিতিশীলতা ও দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য মূল চাবিকাঠি হবে।



