গুলিস্তানের রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে বৃহস্পতিবার দুপুরে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও তথ্যপ্রবাহের ঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য রাখে। সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন উল্লেখ করেন, সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে মিথ্যা ও অপতথ্য প্রচারকে এই নির্বাচনের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জনগণকে সতর্ক করতে তিনি বলেন, “আপনারা আমার সাথে একমত হবেন যে, এবারের নির্বাচনে অন্যতম বড় হুমকি হচ্ছে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে মিথ্যা এবং অপতথ্য প্রচার।” এআই (Artificial Intelligence) প্রযুক্তির অপব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
মনজুর হোসেনের মতে, অপতথ্য প্রচারের মূল উদ্দেশ্য হল কোনো প্রার্থী বা দলকে হেয় করা, ভোটারদের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখা, অথবা নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। তিনি আরও যোগ করেন, “ছোট বিষয়কে অতিরঞ্জিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করাই এই অপপ্রচারের লক্ষ্য।”
এ ধরনের ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে তিনি জনগণকে সহযোগিতা চেয়ে বলেন, “সঠিক সময় বস্তুনিষ্ট এবং তথ্য নির্ভর সংবাদ প্রকাশ হলে এসব মিথ্যাচার অপপ্রচার প্রতিরোধ করা সহজ হবে।” তিনি মিডিয়া সংস্থাগুলোর ভূমিকা ও দায়িত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, সঠিক তথ্যের দ্রুত প্রচারই নিরাপদ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও শান্তিপূর্ণতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। তিনি জানিয়ে দেন, “আমরা এবারের নির্বাচনে এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছি, যা পূর্বের নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।” পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪২ হাজার সেনা সদস্যই মোতায়েন করা হয়েছিল।
বৃহত্তর সংখ্যক সেনা সদস্যের কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন, “এইবার সশস্ত্রবাহিনীকে ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা পূর্বের নির্বাচনগুলোতে ছিল না। ফলে আমরা স্ট্রাইকিং ফোর্সের বদলে সরাসরি কেন্দ্রের আশেপাশে উপস্থিতি বজায় রাখব।” এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল ভোটারদের নিরাপদে ভোট দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা।
সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও টিআইবির (ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো) প্রতিবেদনে কিছু সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। তবে মনজুর হোসেন জোর দিয়ে বলেন, “২০ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত ৩৫ হাজার সেনা সদস্য মাঠে ছিল। সেই সময়ে ঘটিত ঘটনাগুলো আমাদের উপস্থিতি না থাকলে কম হতো না, বেশি হতো না।” তিনি এই ঘটনাগুলোকে নির্বাচনের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভোটারদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সেনাবাহিনী কেন্দ্রের প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। তিনি বলেন, “প্রথমবাবের মত আমরা কেন্দ্রের প্রাঙ্গণেও দায়িত্ব পালন করব, যাতে মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে।” এই পদক্ষেপের মধ্যে নিরাপত্তা গার্ড, সিআইডি ক্যামেরা এবং জরুরি মেডিকেল সেবা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে যে, মিথ্যা তথ্যের দ্রুত বিস্তার নির্বাচনের ফলাফলকে বিকৃত করতে পারে। মনজুর হোসেন উল্লেখ করেন, “যদি তথ্য নির্ভর সংবাদ প্রকাশ না হয়, তবে ভয় ও বিভ্রান্তি বাড়বে, যা ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।” তিনি সকল রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানান, তথ্যের সত্যতা যাচাই করে ভোটারকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে সহযোগিতা করতে।
এদিকে, বাংলাদেশ সরকার নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে চলেছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর যৌথ পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে ও পরে পর্যবেক্ষণ দল গঠন, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন এবং ভোটার সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা হবে।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, সোশাল মিডিয়ার অপতথ্য প্রচার সীমিত করা কঠিন, তবে স্বচ্ছতা ও দ্রুত তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে এর প্রভাব কমানো সম্ভব। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, “যদি সরকার ও সেনাবাহিনী একসাথে কাজ করে, তবে মিথ্যা তথ্যের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।”
ভবিষ্যতে নির্বাচনের ফলাফল ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি কীভাবে গড়ে উঠবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বর্তমান প্রস্তুতি ও সতর্কতা নির্দেশ করে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু করার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সরকার উভয়ই সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভোটারদেরও দায়িত্ব রয়েছে, তারা যেন সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভুয়া খবরের ফাঁদে না পড়ে। তথ্যের সত্যতা যাচাই করে, স্বচ্ছতা বজায় রেখে এবং নিরাপত্তা কর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলা হলে, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মসৃণভাবে সম্পন্ন হবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে মনজুর হোসেন পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, “সোশাল মিডিয়া অপতথ্য প্রতিরোধে আপনারা আমাদের সঙ্গে থাকুন, যাতে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং দেশের গণতন্ত্রের সাফল্য নিশ্চিত হয়।”



