ঢাকা শহরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সামাজিক প্লাটফর্ম ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ আয়োজনের অধীনে ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: সহিংসতার ধারাবাহিকতা এবং সম্প্রীতির দায়বোধ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আইন ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, বিচারহীনতা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা জাতীয় ঐক্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের সঞ্চালনা গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ করেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে স্বাধীন চলচ্চিত্রনির্মাতা সজীব তানভীর, সমাজকেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। তারা সাম্প্রতিক মাসে মাজার, দরগা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটিত হামলা, সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ এবং রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হিংসা সম্পর্কে তথ্য উপস্থাপন করেন।
বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মাজার ও দরগায় কমপক্ষে পনেরোটি হিংসাত্মক আক্রমণ ঘটেছে, যার মধ্যে তিনটি মৃত্যুর কারণ হয়েছে। সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীর ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হুমকি ও শারীরিক আক্রমণ ঘটেছে।
বৈঠকে ২৪ আগস্টের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশ, মাজার ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর অব্যাহত আক্রমণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের সহিংসতা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তাকে ক্ষুণ্ন করছে এবং সামাজিক সম্প্রীতিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
অধিকন্তু, অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আইন প্রয়োগে দেরি করা হিংসা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভোটারদের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাধা সৃষ্টি করছে।
বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ফাহিমা নাসরিন বললেন, “শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের আইন ও প্রশাসনের জায়গাগুলোতে ফ্যাসিস্ট দলের মানুষজন রয়ে গেছে। ভয়ের যে সংস্কৃতি ও ফ্যাসিজম চলেছে, তা আর যেন না আসে। ধর্মকে ব্যবহার করে যারা নারীদের দমন করতে চায়, তারা মুক্তিযুদ্ধের সময়ও নারীদের ওপর সহিংসতার সাথে যুক্ত ছিল। বাংলাদেশ সমস্ত ধর্মের, মতের, পাহাড়ের ও সমতলের মানুষের। বাংলাদেশ আফগানিস্তান নয়। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মান্ধ নয়, বরং ধর্মভীরু। কাউকে বাদ দিয়ে আমরা পথ চলতে পারব না। সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।”
নবী দিবস ও মহাত্মা সম্মেলন উদযাপন পরিষদ ঢাকা বিভাগের সহকারী সচিব শাফায়াৎ এইচ চৌধুরী জানান, “আমরা সবসময় সম্প্রীতি চেয়েছি। মাজারের ওপর হামলার পরেই যদি সবাই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিত, তাহলে পরবর্তী সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোয় হামলা হতো না। আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপন চাই। আমরা বিশ্বাস করি, সহিংসতা কোনো সমাধান নয়।”
বাসদ (মার্ক্সবাদী) কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সমন্বয়ক মাসুদ রানা উল্লেখ করেন যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করে তারা সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের প্রতি সমালোচনা প্রকাশ করছেন।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, আইন ও প্রশাসনের কার্যকরী পদক্ষেপের অভাব এবং বিচারহীনতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে এবং সামাজিক বিভাজন তীব্র হবে। সকল রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটি গোষ্ঠীকে আহ্বান জানানো হয়েছে যে, সহিংসতার কোনো স্থান না রেখে সংলাপ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত।



