চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ বৃহস্পতিবার বিকেলে বন্দর ভবনে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দিনের কর্মবিরতি স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানায়। সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীরের মতে, উপদেষ্টার আশ্বাসের ভিত্তিতে ব্যবস্থা না হলে রবিবার থেকে কর্মসূচি পুনরায় চালু হবে।
প্রতিবাদটি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধে শুরু হয়। শ্রমিকরা শনিবার থেকে আট ঘণ্টা করে, মঙ্গলবার থেকে ধারাবাহিকভাবে কর্মবিরতি পালন করে বন্দর পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। এই সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো আলোচনার উদ্যোগ না নিয়ে কর্মচারীদের বদলি করে, যা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।
বৈঠকে সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন চারটি মূল দাবি উপদেষ্টার সামনে উপস্থাপন করেন। প্রথমটি হল নিউমুরিং টার্মিনালকে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা না দেওয়া, দ্বিতীয়টি হল কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রত্যাহার, তৃতীয়টি হল বন্দর চেয়ারম্যান এস. এম. মনিরুজ্জামানের পদত্যাগের দাবি, এবং চতুর্থটি হল শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কাজের শর্তের উন্নতি।
উপদেষ্টা হোসেন দাবি করেন যে নিউমুরিং টার্মিনাল সংক্রান্ত বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হবে এবং বাকি দাবিগুলোর ব্যাপারে তিনি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। এই আশ্বাসের ভিত্তিতে সংগ্রাম পরিষদ শনিবার পর্যন্ত কর্মবিরতি স্থগিত রাখে, তবে শনিবারের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না এলে রবিবার থেকে আবার কর্মসূচি চালু হবে।
শুক্রবার বিকালে উপদেষ্টা বন্দর চার নম্বর গেটের ফটকের বাইরে কর্মীদের বিক্ষোভের মুখোমুখি হন। পরে বিকালে তিনি বন্দর ভবনে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন, যেখানে তিনি রোজার আগে বন্দর বন্ধ করার পদক্ষেপকে অমানবিক বলে সমালোচনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বন্দর বন্ধ রাখার কোনো আইনগত অধিকার নেই।
বন্দরের কার্যক্রমে ব্যাঘাতের ফলে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্থানীয় শিপিং লাইন এবং রপ্তানি-আমদানি ব্যবসায়ীরা সময়সূচি পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত খরচের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে রপ্তানি-নির্ভর গৃহস্থালি পণ্য ও জ্বালানি পণ্যের সরবরাহে বিলম্বের ঝুঁকি বাড়ছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে টার্মিনাল লিজ চুক্তি রপ্তানি-আমদানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হলেও, শ্রমিকদের বিরোধের ফলে চুক্তির বাস্তবায়ন সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চট্টগ্রাম বন্দরকে কৌশলগত হাব হিসেবে বিবেচনা করার ইচ্ছাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বন্দরের পরিচালনায় কর্মচারী বদলির প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিরোধ শ্রমিকদের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। শ্রমিক ইউনিয়ন ও বন্দর ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমঝোতার অভাব ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি হওয়া কর্মবিরতির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, যা বাণিজ্যিক প্রবাহে ধারাবাহিক ঝুঁকি হিসেবে কাজ করবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বন্দর বন্ধের ফলে দৈনিক গড়ে প্রায় ১.৫ কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। যদিও এই সংখ্যা সরকারী সূত্রে প্রকাশিত নয়, তবে বন্দর কার্যক্রমের স্থবিরতা সরাসরি রপ্তানি-আমদানি আয়কে প্রভাবিত করে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি শ্রমিকদের চাহিদা পূরণ না হয় এবং কর্মবিরতি পুনরায় শুরু হয়, তবে শিপিং কোম্পানিগুলো বিকল্প বন্দর ব্যবহার করতে বাধ্য হবে, যা লজিস্টিক খরচ বাড়াবে এবং পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যে প্রভাব ফেলবে।
অবস্থার সমাধানের জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে ত্রৈমাসিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা জোর দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি পূরণে বন্দর ব্যবস্থাপনা যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, তবে বাণিজ্যিক ক্ষতি কমে যাবে এবং বন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
সংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্মবিরতি দুই দিন স্থগিত হলেও, মূল দাবিগুলোর সমাধান না হলে শ্রমিকরা রবিবার থেকে আবার কর্মসূচি চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতি বন্দর কার্যক্রম, রপ্তানি-আমদানি প্রবাহ এবং বিদেশি বিনিয়োগের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।



