৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) আয়োজিত আর্থিক সততা বিশেষ বৈঠকে বাংলাদেশ সরকার অবৈধ আর্থিক প্রবাহ রোধ ও চুরি সম্পদ ফেরত দিতে আহ্বান জানায়; পুনরুদ্ধারকৃত তহবিল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহার হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী জাতিসংঘে উপস্থিত হয়ে দেশের দাবি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশব্যাপী গণ-অভ্যুত্থান জনগণের মধ্যে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নতুন প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছে।
সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেন, ঐ সময়ের উত্থান জনমনের সজাগতা বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে সরকারকে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চুরি হওয়া সম্পদ দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য, তাই তা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
বক্তা উল্লেখ করেন, তথাকথিত ‘মেগা প্রকল্পগুলো’ সাধারণ মানুষের জন্য সীমিত সুবিধা এনে দেয়, বরং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এবং বিদেশে সম্পদ লুকিয়ে রাখার পথ সুগম করে। এ ধরনের প্রকল্পের স্বচ্ছতা না থাকলে অবৈধ অর্থের প্রবাহ বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এক্ষেত্রে তিনি তথ্যের সঠিক আদান-প্রদান, স্বচ্ছতা ভিত্তিক সহযোগিতা এবং কার্যকর অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানান, যাতে সব সংশ্লিষ্ট পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করে চুরি সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা যায়।
সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী স্পেনে গত জুনে অনুষ্ঠিত চতুর্থ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন সম্মেলনের ফলাফলকে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ঐ সম্মেলনে গৃহীত অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তবে রূপান্তরিত করা দরকার, যাতে পুনরুদ্ধারকৃত তহবিল সরাসরি দেশের মৌলিক সেবা খাতে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষ করে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা জোরদার করার জন্য এই তহবিল ব্যবহার করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এভাবে চুরি সম্পদকে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
জাতিসংঘের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গিয়েছে। কিছু দেশ ইতিমধ্যে তথ্য শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে, যা সম্পদের উৎস ও গন্তব্য ট্র্যাক করতে সহায়তা করবে। তবে কিছু সরকার এখনও প্রক্রিয়ার জটিলতা ও আইনি বাধা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ সরকার এই উদ্বেগগুলোকে স্বীকার করে, তবে জোর দিয়ে বলেন যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া চুরি সম্পদ পুনরুদ্ধার অসম্ভব। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণ সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে তোলার আহ্বান জানান।
পরবর্তী ধাপে, বাংলাদেশ সরকার পুনরুদ্ধারকৃত তহবিলের ব্যবহার পর্যবেক্ষণের জন্য স্বতন্ত্র তদারকি কমিটি গঠন করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এই কমিটি তহবিলের বরাদ্দ, ব্যবহার এবং ফলাফল সম্পর্কে নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করবে।
এছাড়া, দেশীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে, অবৈধ আর্থিক লেনদেনের তদন্ত ও দায়িত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যকে আইনি পদক্ষেপে রূপান্তরিত করা এই পরিকল্পনার মূল অংশ।
সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী শেষ বক্তব্যে উল্লেখ করেন, চুরি সম্পদ পুনরুদ্ধার শুধু আর্থিক বিষয় নয়, এটি দেশের রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জনসাধারণের বিশ্বাস পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আন্তর্জাতিক সমর্থন পেলে বাংলাদেশ সরকার এই লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।



