দিল্লি উচ্চ আদালতে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটি রিট লিখিত আবেদন দাখিল করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নেটফ্লিক্সের নতুন চলচ্চিত্র ‘ঘূস্কর পাণ্ডত’ এর মুক্তি ও স্ট্রিমিং বন্ধ করার দাবি করা হয়েছে। আবেদনকারী মহেন্দ্র চতুর্ভেদি, যিনি নিজেকে শাস্ত্র, দার্শনিকতা ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অধ্যয়ন ও শিক্ষা সমর্পিত আচার্য হিসেবে উপস্থাপন করেন।
মহেন্দ্র চতুর্ভেদি ও তার আইনজীবী বিনীত জিন্দাল এই আবেদনটি দিল্লি উচ্চ আদালতে দাখিল করেন, যেখানে নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়া এবং কেন্দ্র সরকারকে লক্ষ্য করে ম্যান্ডামাসের আদেশ চাওয়া হয়েছে। আবেদন অনুসারে, চলচ্চিত্রের শিরোনাম ও প্রচারমূলক উপকরণ ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের গৌরব ও পরিচয়কে ক্ষুণ্ণ করে।
শিরোনাম ‘ঘূস্কর পাণ্ডত’ এ ব্যবহৃত ‘পাণ্ডত’ শব্দটি পাণ্ডিত্যের সঙ্গে যুক্ত, যা ঐতিহ্যগতভাবে জ্ঞান, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক নির্দেশনার প্রতীক। অন্যদিকে ‘ঘূস্কর’ শব্দটি লঞ্চ বা দুর্নীতির অর্থ বহন করে, যা দুই শব্দের সমন্বয়কে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অবমাননাকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আবেদনকারীর মতে, এই সমন্বয় শুধুমাত্র শিরোনামেই নয়, চলচ্চিত্রের পোস্টার ও টিজার ভিডিওতেও দেখা যায়, যা একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। তিনি যুক্তি দেন যে এ ধরনের উপস্থাপনা সমষ্টিগত মানহানি এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে আবেদনটি সংবিধানের ধারা ১৪, ২১ এবং ২৫-এ নির্ধারিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ভিত্তিতে করা হয়েছে। ধারা ১৪ সমান অধিকার, ধারা ২১ জীবনের ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা, এবং ধারা ২৫ ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলে, যা এই মামলায় প্রভাবিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আবেদনটি ধারা ১৯(১)(ক) অনুসারে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করলেও, ধারা ১৯(২) অনুযায়ী হেট স্পিচ, মানহানি বা সাম্প্রদায়িক সাদৃশ্য বিঘ্ন ঘটাতে পারে এমন বিষয়ের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের কথা উল্লেখ করে। তাই আবেদনকারী দাবি করেন যে চলচ্চিত্রের শিরোনাম ও প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ করা উচিত, যতক্ষণ না মামলার বিষয়টি পরিষ্কার হয়।
মহেন্দ্র চতুর্ভেদি উল্লেখ করেন যে তিনি শিরোনাম ও প্রচারমূলক সামগ্রীকে নিজের পেশাগত পরিচয় ও আচার্যের মর্যাদার ওপর আঘাতকারী হিসেবে দেখেন। তিনি দাবি করেন যে এই বিষয়টি শুধুমাত্র সম্প্রদায়ের গৌরবই নয়, তার নিজস্ব ধর্মীয় শিক্ষার কার্যক্রমকেও প্রভাবিত করছে।
আবেদনপত্রে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে যুক্ত ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়াকে নির্দেশ করা হয়েছে যে, চলচ্চিত্রের মুক্তি ও স্ট্রিমিং বন্ধ না করা হলে জনশান্তি ও সামাজিক সাদৃশ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আবেদনটি আদালতকে নির্দেশ দেয় যে, এই বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো রিলিজ বা অনলাইন স্ট্রিমিং করা যাবে না।
দিল্লি উচ্চ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া এখনও চলমান, তবে আবেদনটি ইতিমধ্যে মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। কিছু বিশ্লেষক চলচ্চিত্রের শিরোনামকে সৃজনশীল স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখলেও, অন্যরা সম্প্রদায়ের সংবেদনশীলতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
নেটফ্লিক্সের প্রতিনিধিরা এখনো এই মামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য প্রকাশ করেননি, তবে কোম্পানি সাধারণত আইনি আদেশের পরিপালনে প্রতিক্রিয়া জানায়। যদি আদালত ম্যান্ডামাসের আদেশ প্রদান করে, তবে চলচ্চিত্রের মুক্তি তারিখ পুনরায় নির্ধারণ বা শিরোনাম পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকতে পারে।
এই মামলার মূল বিষয় হল সৃজনশীল প্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর গৌরব রক্ষার মধ্যে সমতা বজায় রাখা। আদালত কীভাবে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা ব্যাখ্যা করে সিদ্ধান্ত নেবে, তা ভবিষ্যতে অনুরূপ বিষয়ের জন্য দিকনির্দেশনা হতে পারে।
পাঠকদের জন্য পরামর্শ, যে কোনো চলচ্চিত্র বা মিডিয়া কন্টেন্ট দেখার আগে তার বিষয়বস্তু ও প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। একই সঙ্গে, সামাজিক সংহতি রক্ষার জন্য সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রয়োজন।



