মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বৃহৎ পলায়ন ঘটার দশ বছর পরও, শরণার্থী সংকট আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের স্পষ্ট ব্যর্থতা হিসেবে রয়ে গেছে। লক্ষাধিক রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাস করে, নিরাপত্তা ও স্থায়ী পুনর্বাসনের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য স্পষ্ট আইনি কাঠামো বিদ্যমান, তবে বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে।
মায়ানমার গেনেভা চুক্তি, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং ১৯৪৮ সালের গণহত্যা নিষেধাজ্ঞা চুক্তি সহ বহু আন্তর্জাতিক নীতি মেনে চলতে বাধ্য, তবু রোহিঙ্গাদের উপর চলমান সহিংসতা ও নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। এই আইনি বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও, শরণার্থীদের ন্যায়সঙ্গত পুনরায় বসতি, সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যায়নি।
গাম্বিয়ার মায়ানমার বিরুদ্ধের মামলায় আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (ICJ) ২০২০ সালে সাময়িক ব্যবস্থা আদেশ করে, যা গণহত্যা বন্ধ করা এবং প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়। এই আদেশের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সংকটের গুরুতরতা সম্পর্কে সচেতন করা এবং মায়ানমারকে আইনি দায়িত্বে টেনে আনা।
তবে, আদেশের বাস্তব প্রয়োগ সীমিত রয়ে গেছে; রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান অব্যাহত, মানবিক সাহায্যের প্রবেশ কঠিন এবং অপরাধের দায়িত্বে কোনো স্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের নৈতিক ও আইনি প্রভাব যদিও স্বীকৃত, তার কার্যকরী ক্ষমতা অপর্যাপ্ত বলে বিবেচিত।
আদালতের কাছে নৈতিক ও আইনি কর্তৃত্ব থাকলেও, বাধ্যতামূলক প্রয়োগের কোনো প্রক্রিয়া নেই, ফলে তার রায় প্রায়ই আনুষ্ঠানিক নিন্দা রূপে সীমাবদ্ধ থাকে। এই পরিস্থিতি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ন্যায়বিচারকে কেবল কাগজে লিখিত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ করে রাখে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত) ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে জোরপূর্বক স্থানান্তরের মতো সীমান্ত পারাপার অপরাধের জন্য তদন্তের অনুমতি দেয়। মায়ানমার রোম স্ট্যাটিউটের স্বাক্ষরকারী না হলেও, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অপরাধের কিছু অংশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
তবে, আদালত মায়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘটিত বিশাল মানবাধিকার লঙ্ঘনকে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছাদন করতে পারেনি, কারণ দেশটি রোম স্ট্যাটিউটের সদস্য নয়। অপরাধী কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা ছাড়া গ্রেফতার ও বিচারের সম্ভাবনা সীমিত, ফলে তদন্তের ফলাফল বাস্তব ন্যায়বিচারে রূপান্তরিত হওয়া কঠিন।
এইসব বাধা মিলিয়ে দেখা যায়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার দেরি হয়ে বাস্তবে অস্বীকারের সমতুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও, বাস্তবায়নের অভাবই মূল সমস্যার মূল।
ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে; চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তে ভেটো ব্যবহার করে মায়ানমারকে কঠোর পদক্ষেপ থেকে রক্ষা করেছে। একইসঙ্গে, আঞ্চলিক সংস্থা ASEAN-এর হস্তক্ষেপ না করার নীতি শরণার্থী সংকটে কূটনৈতিক সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সারসংক্ষেপে, রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের কাঠামোতে স্পষ্ট ফাঁক প্রকাশ করে। আইনি নিয়মের উপস্থিতি যথেষ্ট নয়; ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছা ছাড়া শরণার্থীরা নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না।



