চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এর লিজ বাতিলের দাবি নিয়ে শ্রমিকদের ষষ্ঠ দিনের কর্মবিরতি চলতে থাকায়, বন্দর কর্তৃপক্ষ নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নেয়। বৈঠকটি বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩:৩০ টায় বন্দর বোট ক্লাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, যেখানে শ্রমিক-কর্মচারীদের ১৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেবে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হল ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের দাবি নিয়ে পারস্পরিক সমঝোতা গড়ে তোলা।
শ্রমিক-কর্মচারীরা শনিবার থেকে প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি বজায় রেখেছে এবং এখন পর্যন্ত মোট ছয় দিন ধরে টার্মিনাল বন্ধ রয়েছে। তাদের একমাত্র দাবি হল ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি রদ করা, যার পরই তারা কর্মবিরতি ত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এই দাবি পূরণ না হলে শ্রমিকরা বিদ্যমান বিরতি চালিয়ে যাবে বলে স্পষ্ট করে জানিয়েছে প্রতিনিধিদের দল।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বৈঠকের আগে বন্দর ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে উল্লেখ করেন, কোনো সমাধান আলোচনা ছাড়া সম্ভব নয়, তাই উপদেষ্টার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, উপদেষ্টা চুক্তির আর্থিক দিক সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবগত নন, এবং এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করে উপস্থাপন করা হবে যাতে চুক্তিটি দেশের স্বার্থের বিরোধী বলে প্রমাণিত হয়।
হুমায়ুন কবিরের মতে, উপদেষ্টা দেশের স্বার্থের বিরোধী কোনো চুক্তি অনুমোদন করবেন না, এ বিষয়ে তিনি আশ্বাস পেয়েছেন। তবে তিনি বন্দর চেয়ারম্যানকে বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য দায়ী করে, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মন্তব্যকে পরিস্থিতি আরও খারাপ করার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবু তিনি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন।
সকাল ১০ টায় নৌপরিবহন উপদেষ্টা এবং বন্দর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন, তবে সেখানে কোনো সমাধান বের হয়নি। একই দিনে দুপুরের দিকে উপদেষ্টা বন্দর ত্যাগ করেন, ফলে শ্রমিকরা ‘ভুয়া, ভুয়া’, ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড গো ব্যাক’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যায়। এই মুহূর্তে কর্মীদের মধ্যে হতাশা ও বিরক্তি স্পষ্ট দেখা যায়।
বন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তীব্রতর করা হয়েছে; পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। সব গেট বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের টার্মিনালে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই এবং বন্দর কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থগিত রয়েছে। এই কঠোর পদক্ষেপের লক্ষ্য হল অশান্তি দমন করা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখা।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, টার্মিনাল বন্ধের ফলে কন্টেইনার লোডিং ও আনলোডিং কাজ থেমে গেছে, যা রপ্তানি-আমদানি শিপমেন্টে বিলম্ব সৃষ্টি করছে। রপ্তানিকৃত পণ্যের সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারা ব্যবসায়িক অংশীদারদের অতিরিক্ত খরচ এবং দেরি জরিমানা বহন করতে হচ্ছে। এছাড়া, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সম্ভাব্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীর আস্থা কমিয়ে দেয় এবং ভবিষ্যৎ কন্টেইনার টার্মিনাল উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বন্দরের সম্পূর্ণ বন্ধ অবস্থা দেশের সামগ্রিক লজিস্টিক্স সিস্টেমে চাপ বাড়াচ্ছে; সমুদ্রপথে পণ্য সরবরাহের ব্যাকলগ বাড়ার ফলে অভ্যন্তরীণ পরিবহন খাতে অতিরিক্ত লোডিং দেখা দেবে। এই পরিস্থিতি শিপিং লাইন, ফ্রেট ফারওয়ার্ডার এবং রপ্তানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত অপারেশনাল ব্যয় এবং সময়সীমা পুনর্গঠনকে বাধ্য করবে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, যদি শ্রমিকের দাবি পূরণ না হয় এবং কর্মবিরতি দীর্ঘায়িত হয়, তবে বন্দর আয় এবং দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের ফলে টার্মিনালের পরিচালনায় নতুন অপারেটর বা সরকারি ব্যবস্থাপনা মডেল গৃহীত হলে, স্বল্পমেয়াদে পুনর্গঠন খরচ বাড়তে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে স্বার্থ রক্ষার দিক থেকে তা উপকারী হতে পারে। তাই উভয় পক্ষের জন্য দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সমঝোতা বাণিজ্যিক ক্ষতি কমাতে এবং বন্দর কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে গুরুত্বপূর্ণ।



