দুই বছর আগে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে খতনা করানোর সময় পাঁচ বছর বয়সী শিশু আয়ান আহমেদের মৃত্যু ঘটার পর পুলিশ তিনজন চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার প্রমাণ পাওয়া দাবি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এনেসথেসিয়া স্পেশালিস্ট সৈয়দ সাব্বির আহমেদ (৩২), সার্জন তাসনুবা মাহজাবীন (৩৮) এবং সহকারী স্পেশালিস্ট এনেসথেসিয়া নাজিম উদ্দিন (৩৪) অপারেশনের সময় প্রয়োজনীয় প্রোটোকল অনুসরণে ব্যর্থ হন।
আয়ানকে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার সাঁতারকুল এলাকায় অবস্থিত ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে খতনা করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর শিশুটি পুনরায় সচেতন হয় না এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দেয়। অবিলম্বে তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তবে শ্বাসযন্ত্রের জটিলতা বাড়ার ফলে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি শিশুটি মৃত্যুবরণ করে।
আয়ানের বাবা শামীম আহমেদ ঘটনাস্থলে বাড্ডা থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্তে প্রকাশ পায় যে, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল যথাযথ নিবন্ধন ছাড়াই চিকিৎসা সেবা প্রদান করছিল, ফলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালের সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়।
পুলিশের অভিযোগপত্রে ময়নাতদন্তের ফলাফল উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুর মৃত্যু শ্বাসকষ্টের কারণে, এবং লিডোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড ও বেন্টোডায়াজেপিনের জটিল প্রয়োগের ফলে শ্বাসযন্ত্রে অ্যান্টিমর্টেম প্রভাব দেখা দেয়। অতিরিক্তভাবে, লিভার ও কিডনির নির্দিষ্ট অংশে ক্ষতি এবং রক্তে লিডোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড ও বেনজোডায়াজেপিনের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী তদন্তের পর ২২ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এতে নাজিম উদ্দিনকে পলাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর সাব্বির ও তাসনুবা দুজনকে আগাম জামিনে রয়েছে। বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর হাকিম মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম অভিযোগপত্র হাতে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মো. কামাল হোসেন জানান, তাসনুবা ও সাব্বির জামিনে ছিলেন, তবে আদালতে হাজির হননি।
তদন্তকারী কর্মকর্তার নোটে উল্লেখ আছে যে, অপারেশনের পূর্বে ডা. সাব্বির ও ডা. নাজিম উভয়ই আয়ানকে অজ্ঞান করার জন্য প্রয়োজনীয় ইনজেকশন প্রদান করেন এবং পুরো প্রক্রিয়ায় তারা সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। অপারেশন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের তত্ত্বাবধানে কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধের আদেশ দেয় এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ করে। রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য হাসপাতালগুলোকে সঠিক নিবন্ধন, প্রোটোকল অনুসরণ এবং অ্যানেসথেসিয়া ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হবে।
শিশু রোগীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে হাসপাতালগুলোকে নিয়মিত অডিট ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা জরুরি। তদুপরি, রোগীর পরিবারকে চিকিৎসা প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রদান করা উচিত।
শিশু রোগীর মৃত্যু একটি দুঃখজনক বাস্তবতা, তবে এটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। ভবিষ্যতে এধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কি ধরনের নীতি ও তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।



