গত মঙ্গলবার, বাংলাদেশ সরকার ও জাপান সরকারের মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান এবং জাপানের বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সাইডা শিনিচি অংশ নেন।
চুক্তিটি ২০২৩ সাল থেকে উভয় পক্ষের ধারাবাহিক আলোচনার ফলস্বরূপ সম্পন্ন হয় এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন স্তরকে চিহ্নিত করে। এতে উল্লেখ আছে যে, বাংলাদেশ সরকার আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম অর্জনের জন্য জাপান সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, পাশাপাশি যৌথ গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলবে।
প্রতিবেদন অনুসারে, এই চুক্তি জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত। চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার তার প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য রাখে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রেক্ষাপটের দিক থেকে, ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টোকিও সফরের প্রস্তুতি চলাকালীন এই চুক্তির আলোচনা তীব্রতা পায়। তবে সফরটি শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়। সেই সময়ে জাপান সরকার বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সংকটের কথা জানার পর সমরাস্ত্র বিক্রির বিষয়ে বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে ইচ্ছুকতা প্রকাশ করে। এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে সমরাস্ত্র বিক্রয় ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সামরিক বিশেষজ্ঞের বিনিময় বৃদ্ধি। উভয় পক্ষের বিশেষজ্ঞদের পারস্পরিক প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নত হবে এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “বাংলাদেশ সরকার ও জাপান সরকারের মধ্যে এই ধরনের চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করবে, এবং উভয় দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে সমৃদ্ধ করবে।” বিশ্লেষক আরও উল্লেখ করেন, এই চুক্তি জাপানের দক্ষিণ এশিয়া নীতি ও বাংলাদেশ সরকারের বহুমুখী কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়কে প্রতিফলিত করে।
অতীতের অন্যান্য চুক্তির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, জাপান সরকার পূর্বে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের সঙ্গে সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তি সহযোগিতা চুক্তি করেছে, তবে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এই চুক্তি প্রথমবারের মতো সমন্বিত গবেষণা ও উন্নয়নের কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করে। এই দিকটি দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই, বাংলাদেশ সরকার চীনের সঙ্গে ড্রোন উৎপাদনের জন্য সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই পরিস্থিতি অঞ্চলগত নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন শক্তির ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়ার পার্থক্যকে তুলে ধরে।
ভবিষ্যৎ মাইলস্টোন হিসেবে, উভয় দেশ ২০২৪ সালের শেষের মধ্যে প্রথম প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ প্রশিক্ষণ সেশন চালু করার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া, চুক্তির অধীনে গৃহীত গবেষণা প্রকল্পগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সমন্বিত করে ত্বরান্বিত করা হবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ সরকার ও জাপান সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই প্রতিরক্ষা চুক্তি দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস, কূটনৈতিক সমন্বয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। এটি বাংলাদেশ সরকারের আধুনিক প্রতিরক্ষা কাঠামো গঠনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় জাপানের ভূমিকা শক্তিশালী করবে।



