জাতিসংঘের উপদেষ্টা পরিষদের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক বৈঠকে বাংলাদেশ সরকার গুম সংক্রান্ত সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহারের প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। সভা প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রেস উইংের এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
গৌণমানবিক নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন ১৯৮৪ সালে গৃহীত হয় এবং বর্তমানে ১৭৩টি রাষ্ট্র এই চুক্তিতে অনুসমর্থন করেছে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে কনভেনশনে যোগদান করে, তবে অনুচ্ছেদ ১৪(১)-এর অধীনে সংরক্ষণী শর্ত যুক্ত করেছিল।
অনুচ্ছেদ ১৪(১) গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারা। বাংলাদেশসহ মোট পাঁচটি দেশ—বাহামা, ফিজি, নিউজিল্যান্ড, সামোয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র—চুক্তিতে যোগদানের সময় এই ধারা সম্পর্কে সংরক্ষণী শর্ত প্রয়োগ করেছিল।
সংরক্ষণী শর্তের ফলে গুমের শিকারদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই শর্তগুলো ভুক্তভোগীর পরিবারকে যথাযথ আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত করত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যহীন অবস্থায় রাখত।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বাংলাদেশ সরকার সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহারের প্রস্তাব উপস্থাপন করে এবং তা একমত ভোটে অনুমোদিত হয়। প্রেস উইংের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে গুমের শিকারদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া সহজতর হবে।
প্রস্তাবের অনুমোদনের পর, গুমের শিকারদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে তাদের নির্ভরশীল পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হবে। ফলে শিকারদের মৃত্যুর পরেও আর্থিক সহায়তা বন্ধ না হয়ে পরিবারকে সুরক্ষা প্রদান করা সম্ভব হবে।
উপদেষ্টা পরিষদের মন্তব্যে এই সিদ্ধান্তকে “যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বলেন, সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহার বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ক্ষেত্রে আরও দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে যাবে এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করবে।
অন্যদিকে, কিছু রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহারের পর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পর্যাপ্ত তদারকি ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তারা জোর দিয়েছেন যে দেশীয় আইন ও নীতি অনুযায়ী শিকারদের দ্রুত ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করা নিশ্চিত করা উচিত।
বাংলাদেশ সরকার এই পদক্ষেপকে দুই দশকের মানবাধিকার কর্মীদের দাবি পূরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সরকার দাবি করে, সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহার দেশের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং গুমের শিকারদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রেটিংয়ে উন্নতি পাবে এবং উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে, দেশীয় পর্যায়ে শিকারদের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার চাপ বাড়বে।
জাতিসংঘের উপদেষ্টা পরিষদে গুম সংক্রান্ত সংরক্ষণী শর্ত প্রত্যাহারের প্রস্তাবের অনুমোদন বাংলাদেশকে মানবাধিকার সংরক্ষণে একটি নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। ভবিষ্যতে এই পদক্ষেপের কার্যকরীতা পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং প্রয়োজন অনুসারে অতিরিক্ত নীতি সমন্বয় করা হতে পারে।
এই পরিবর্তনটি গুমের শিকারদের এবং তাদের পরিবারকে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি এনে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সিস্টেম গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।



