জাতীয় নির্বাচনের ত্রয়োদশ ধাপের এক সপ্তাহ বাকি থাকলেও সিলেট বিভাগে চা বাগানের শ্রমিকরা ভোটের প্রতি উদাসীন মনোভাব বজায় রেখেছে। বহু বছর ধরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া এবং অবহেলার ফলে তারা ভোটের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
চা শ্রমিকরা ঐ অঞ্চলের একটি বড় ভোটার গোষ্ঠী গঠন করলেও, প্রার্থীরা কেবল নির্বাচনের সময়ই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং ফলাফল ঘোষণার পর কোনো বাস্তব উন্নয়ন করে না বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। এই অবহেলা তাদের মৌলিক জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করছে।
বিভাগের চা বাগানে অবিকল রাস্তা, নিরাপদ পানীয় জলের অভাব, শিক্ষার সুবিধার ঘাটতি, হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সের অনুপস্থিতি এবং চলমান স্বাস্থ্যঝুঁকি শ্রমিকদের মুখোমুখি সমস্যার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তারা ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার আশায় কম আত্মবিশ্বাসী।
শিল্পের সূত্র অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে ১৫৮টি চা বাগানে কয়েক লক্ষ শ্রমিক কর্মরত। যদিও তাদের ভোট প্রায়শই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তবু তাদের বসবাসের পরিবেশে কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি।
চাঁদিচারা চা বাগানের এক শ্রমিক রতন ঘাটুয়াল ছয় মাসের শিশুকে নিয়ে কাজ করেন, কারণ পরিবারের আর্থিক চাহিদা মেটাতে তাকে কাজ ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। তিনি বলেন, “আমরা কাকে ভোট দেব? নির্বাচনের পর তারা আর দেখা যায় না।” একই বাগানের আরেকজন শ্রমিক মেঘনা মৃধা এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি যে তারা ভোট দেবেন কিনা।
সিলেটের খাদিম চা বাগানের রঞ্জন কুরমি রোগীর হাসপাতালে পৌঁছানোর কঠিনতা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া খুব কঠিন হয়। নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না।”
হাবিগঞ্জের নোয়াপাড়া চা বাগানের নয়ন বাউরি বলছেন, এইবার তারা ভোটের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকবে। “যে প্রার্থী সত্যিকারের আমাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করবে, তারই ভোট দেব।” এই মনোভাব ভোটের গুণগত মান বাড়াতে পারে বলে তিনি আশাবাদী।
মৌলভীবাজারের চাটলাপুর চা বাগানের যুবক সুমন গোয়ালা পর্যটন উন্নয়নের সম্ভাবনা উল্লেখ করে বলেন, “যদি পর্যটন সঠিকভাবে বিকশিত হতো, তবে আমাদের এলাকায় কাজের জন্য অন্যত্র যাওয়ার দরকার না থাকত।” তিনি স্থানীয় পর্যটনকে অর্থনৈতিক বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
শহুজন (শহুরে উন্নয়ন) সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নরমাল এস পলাশ, কামালগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সরকারী উদ্যোগ অপর্যাপ্ত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি প্রার্থীদের পরিকল্পিত, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন প্রকল্পে মনোযোগ দিতে আহ্বান জানান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রার্থী নির্বাচনের সময় চা বাগান শ্রমিকদের জন্য উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে সেগুলোর বাস্তবায়ন এখনো স্পষ্ট নয়। এই পরিস্থিতি ভোটারদের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে এবং নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন, যদি প্রার্থীরা বাস্তবিক পদক্ষেপ না নেয় এবং চা বাগানের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান না করে, তবে শ্রমিকদের ভোটের অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে, যা রাজনৈতিক পার্টিগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
অবশেষে, সিলেটের চা বাগান শ্রমিকদের ভোটের প্রতি উদাসীনতা এবং তাদের মৌলিক চাহিদার অবহেলা দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত যখন ভোটের ফলাফল নির্ধারণে এই গোষ্ঠীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে কীভাবে প্রার্থীরা এই সমস্যাগুলো মোকাবেলা করবে, তা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



