১৯ বছর বয়সী অটিস্টিক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় চাঁদমান শাহরিয়ার গত বছরের সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিকে পুরুষ সিঙ্গেল, পুরুষ ডাবলস এবং ইউনিফায়েড তিনটি ইভেন্টে স্বর্ণপদক জয় করে দেশের ক্রীড়া জগতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই সাফল্য তাকে বাংলাদেশের অটিস্টিক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়দের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের গর্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। তার বিজয়ী পারফরম্যান্সের ফলে স্পেশাল অলিম্পিকের পরবর্তী সংস্করণে, ২০২৭ সালে চিলিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ইভেন্টে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়েছে।
শাহরিয়ার আড়াই বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে গুরুতর ক্ষতি ভোগ করেন; রোগের ফলে তার কথা বলার ক্ষমতা এবং শোনার ক্ষমতা দুটোই হারিয়ে যায়। এই অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের পরেও তার পরিবার তাকে সমর্থন করে এবং তার পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মৌলিক যোগাযোগের বিকল্প পদ্ধতি শিখে জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হন।
ছয় বছর বয়সে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তিনি বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ শুরু করেন এবং দ্রুতই তার বহুমুখী প্রতিভা প্রকাশ পায়। প্রথম দিকের প্রতিযোগিতায় ৫০ মিটার ও ১০০ মিটার দৌড়ে পাশাপাশি চিত্রাঙ্কনেও তিনি শীর্ষে ছিলেন। এই ধারাবাহিক সাফল্য তাকে শিক্ষকদের নজরে এনে দেয় এবং আরও বড় মঞ্চে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দেয়।
প্রায় ছয় ফুট (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি) উচ্চতার চাঁদমান শারীরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ফুটবল, সাঁতার এবং ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলায় দক্ষতা অর্জন করেন। তার উচ্চতা এবং শারীরিক গঠন তাকে কোর্টে সুবিধা প্রদান করে, বিশেষ করে ব্যাডমিন্টনে দ্রুত গতিবিধি এবং শক্তিশালী শটের জন্য। এই বহুমুখী ক্রীড়া পটভূমি তার পরবর্তী ক্রীড়া ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ে তোলে।
বিদ্যালয়ের পরিধি অতিক্রম করে তিনি জেলা, বিভাগ এবং জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ শুরু করেন এবং ধারাবাহিকভাবে podium-এ স্থান অর্জন করেন। ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ট্যালেন্ট হান্টে তিনি ব্যাডমিন্টন ও সাঁতারে প্রথম এবং দৌড়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এই সাফল্য তার ক্রীড়া জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়।
তবে শীতল বাতাসে সাঁতার কাটার সময় শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি সাঁতার থেকে দূরে সরে আসতে বাধ্য হন, যা তার ক্রীড়া জীবনে একটি অস্থায়ী বাধা সৃষ্টি করে। সাঁতার ছেড়ে দেওয়া সত্ত্বেও তিনি ব্যাডমিন্টনের প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখেন এবং নিজের দক্ষতা আরও উন্নত করেন। তার দৃঢ়সংকল্প এবং নিয়মিত অনুশীলন শেষমেশ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দরজা খুলে দেয়।
সরকারি সহায়তা, ধারদেনা এবং অনুদানের সমন্বয়ে তিনি গত বছরের সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিকের জন্য প্রস্তুতি নেন এবং সেখানে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ইভেন্টে তিনি পুরুষ সিঙ্গেল, পুরুষ ডাবলস এবং ইউনিফায়েড তিনটি শাখায় স্বর্ণপদক জয় করে একাধিক রেকর্ড ভেঙে দেন। এই জয় তার ক্রীড়া ক্যারিয়ারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায় এবং দেশের ক্রীড়া সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে তার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।
বর্তমানে চাঁদমান বাংলাদেশের অটিস্টিক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়দের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করেন এবং তার নাম আন্তর্জাতিক স্পেশাল অলিম্পিকের তালিকায় সর্বদা প্রথম স্থানে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন এবং ফেনী ব্যাডমিন্টন একাডেমির কোচ ও পরিচালক আবদুল হান্নান উল্লেখ করেন, তিনি দেশের অটিস্টিক ক্রীড়াবিদদের মধ্যে এক নম্বর এবং ২০২৭ সালের স্পেশাল অলিম্পিকের তালিকায় তার নাম শীর্ষে রয়েছে। এই স্বীকৃতি তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
চাঁদমানের পরবর্তী লক্ষ্য ২০২৭ সালে চিলিতে অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিকের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া, তবে তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অংশগ্রহণে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। সরকারী সহায়তা সীমিত থাকায় অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহের জন্য স্থানীয় দাতব্য সংস্থা এবং ব্যক্তিগত দানকারীদের সহায়তা প্রয়োজন। এই আর্থিক বাধা দূর করা হলে চাঁদমান আন্তর্জাতিক মঞ্চে আবারও দেশের গর্ব বাড়াতে সক্ষম হবেন।



