ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অস্বাভাবিক পরিবর্তন চিহ্নিত করেছে। দীর্ঘদিনের দু’জন প্রধান নারী নেতা—খালেদা জিয়া, যিনি সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করেছেন, এবং শেখ হাসিনা, যিনি বর্তমানে বিদেশে রাষ্ট্রদূতীয় সফরে আছেন—এইবারের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করছেন না। ফলে, প্রথমবারের মতো দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই নারী নেতৃত্বের অভাবে ভোটারদের সামনে দাঁড়াচ্ছে, যা ১৯৮০‑এর মাঝামাঝি থেকে দেখা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে, ভোটার অংশগ্রহণ, শাসনব্যবস্থার জবাবদিহিতা এবং প্রতিনিধিত্বের মানদণ্ডে বাস্তবিক পরিবর্তন হবে কি, তা নিয়ে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
বৈধভাবে নির্বাচনী তালিকা প্রকাশের পর, প্রধান দলগুলো নতুন প্রার্থীদের তালিকাভুক্তি শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই তরুণ ও নতুন মুখের ওপর জোর দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে, যদিও উভয় পার্টির অভ্যন্তরে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের উপস্থিতি এখনও দৃশ্যমান। প্রচারাভিযানের ভাষা পূর্বের তুলনায় বেশি নীতি-ভিত্তিক ও উন্নয়নমুখী, তবে রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও জাতীয় গর্বের প্রতীকী ব্যবহারও তীব্রভাবে দেখা যাচ্ছে।
অন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন বহিরাগত সংস্থার সঙ্গে আলোচনায় জড়িত হয়েছে। বিদেশি মিডিয়া ও মানবাধিকার সংস্থা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা সম্পর্কে মন্তব্য করেছে, আর সরকার এসব মন্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে নির্বাচনী শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রভাবও নির্বাচনী রণকৌশলে প্রতিফলিত হয়েছে, বিশেষ করে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক চুক্তিগুলোকে ভোটারদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতীকী রাজনীতির দিকেও নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। প্রচার পোস্টার, রেলগাড়ি ও রেডিও বিজ্ঞাপনে ঐতিহ্যবাহী চিত্র ও স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে, তবে সেগুলো আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করা হয়েছে। সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার বাড়ার ফলে, পার্টিগুলো অনলাইন ক্যাম্পেইন, লাইভ স্ট্রিম এবং ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভোটারদের পছন্দ নির্ণয় করছে। এই পরিবর্তনগুলো নির্বাচনের দৃশ্যপটকে ভিন্ন রঙে রাঙিয়ে তুলেছে, যদিও মূল কাঠামোতে বড় পরিবর্তন দেখা যায় না।
বিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিএনপি ও জয়ন্তা পার্টি উভয়ই সরকারকে ভোটারদের সরাসরি শাসনের সুযোগ না দিয়ে পার্টি-নেতৃত্বাধীন কাঠামো বজায় রাখার অভিযোগ তুলেছে। তারা দাবি করে যে, নারী নেতাদের অনুপস্থিতি কেবল একটি অস্থায়ী ঘটনা, এবং আসন্ন নির্বাচনে সত্যিকারের বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশের সুযোগ কমে যাবে। তবে, কিছু বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন যে, নতুন প্রার্থীদের উত্থান ও প্রচার কৌশলের পরিবর্তন ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ধরণকে পুনর্গঠন করতে পারে।
এই নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি নতুন প্রার্থীরা শাসনব্যবস্থার জবাবদিহিতা ও ন্যায্যতা বাড়াতে সক্ষম হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার শক্তিবৃদ্ধি করবে। অন্যদিকে, যদি পুরনো কাঠামোই বজায় থাকে, তবে ভোটারদের আস্থা হ্রাস পেতে পারে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
পরবর্তী ধাপ হিসেবে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা আপডেট, ভোটার শিক্ষা ও নিরাপদ ভোটিং মেশিনের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করছে। সরকারও নির্বাচনের পূর্বে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এইসব ব্যবস্থা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দুই প্রধান নারী নেতার অনুপস্থিতিতে নতুন রূপ নেয়, তবে মূল কাঠামোতে বড় পরিবর্তন না ঘটলেও, প্রচার ভাষা, আন্তর্জাতিক সংকেত ও প্রতীকী রাজনীতির পরিবর্তন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথে প্রভাব ফেলবে। ভোটারদের অংশগ্রহণ ও শাসনব্যবস্থার জবাবদিহিতা কতটা উন্নত হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে নির্ভর করবে।



