বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনচিহ্ন নিকটবর্তী হওয়ায়, ব্রাসেলস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (ICG) নতুন সরকারের জন্য পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। এই বিশ্লেষণ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগে প্রকাশিত হওয়ায়, শাসন পরিবর্তনের প্রস্তুতিতে রাজনৈতিক দল ও নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্বল শাসন কাঠামো, বিশেষত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, গার্মেন্টস শিল্প ও রেমিট্যান্সের অতিরিক্ত নির্ভরতা, এবং তীব্র জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নতুন প্রশাসনের মুখোমুখি হবে। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিচারিক স্বায়ত্তশাসন, দুর্নীতি বিরোধী সংস্থার স্বতন্ত্রতা এবং স্থানীয় শাসনের কার্যকারিতা অন্তর্ভুক্ত।
অর্থনৈতিক দিক থেকে, রপ্তানি-নির্ভর গার্মেন্টস সেক্টরের ধীরগতি এবং বিদেশি মুদ্রা আয়ের জন্য রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। সরকারকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষি আধুনিকায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ ত্বরান্বিত করতে হবে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে, ভারতসহ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার প্রভাব এবং রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই বিষয়গুলো কূটনৈতিক সমঝোতা, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং মানবিক সহায়তার সমন্বয় দাবি করে, যা নতুন সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতা পরীক্ষা করবে।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য পদত্যাগের পর, হিজবুত-তাহরিরের মতো উগ্র ইসলামিক গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অতীতের সন্ত্রাসী হামলা ও ধর্মীয় উত্তেজনা সরকারকে নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা এবং গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয় শক্তিশালী করতে বাধ্য করবে।
বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার জটিলতা নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে; ঐতিহাসিক ভোটভিত্তি ও শক্ত ভিত্তির কারণে দলটিকে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া কঠিন। অতএব, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের মাধ্যমে সকল প্রধান দলকে শাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা জরুরি।
প্রতিবেদন উল্লেখ করে যে, প্রধান রাজনৈতিক দল ও প্রাসঙ্গিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের পুনরায় নির্বাচনী মঞ্চে ফিরে আসার শর্ত নিয়ে ঐকমত্য গড়ে উঠলে সংঘাতের ঝুঁকি কমতে পারে। বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীর সমর্থন নিশ্চিত করা হলে সরকারকে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
এ জন্য আওয়ামী লীগকে অতীতের সহিংসতার জন্য দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে, যা বর্তমানে শেখ হাসিনার অস্বীকৃত অবস্থায় রয়েছে; এই পদক্ষেপ না নিলে সমঝোতা অর্জন কঠিন হবে। রাজনৈতিক শত্রুতার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমা ও দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।
ইন্ডিয়া এবং অন্যান্য প্রভাবশালী দেশগুলোকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে রাজনৈতিক সমঝোতার পথে অগ্রগতি সম্ভব হয়। অতীতের কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো দেখায় যে, বহুপক্ষীয় সমঝোতা প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা প্রায়শই সফলতা বাড়ায়।
যদি নতুন সরকার তরুণদের উচ্চ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি বাড়তে পারে, যা সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করবে। যুবসমাজের হতাশা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক পতনের কারণ হতে পারে।
গার্মেন্টস সেক্টরের ধীরগতি ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সীমিত করতে পারে, ফলে সরকারকে বৈচিত্র্যকরণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করতে হবে। কৃষি, পর্যটন এবং পরিষেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে রপ্তানি পণ্য বৈচিত্র্যকরণ করা জরুরি।
বর্ধমান বন্যা, সাইক্লোন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান দেশের কৃষি ও অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অভিযোজন কৌশলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের ব্যবহার এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
সারসংক্ষেপে, ICG যে পাঁচটি মূল চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে—শাসন কাঠামো, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, জলবায়ু ঝুঁকি, জটিল পররাষ্ট্রনীতি এবং রাজনৈতিক সমঝোতা—এগুলো সমন্বিতভাবে মোকাবিলা না করলে নতুন সরকার দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে। এই চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের জন্য নীতি নির্ধারকদের সমন্বিত কৌশল, বহুপক্ষীয় সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।



