মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া আজ (বৃহস্পতিবার) তাদের শেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি, নিউ স্টার্ট, সমাপ্তির মুখে। ২০১০ সালে প্রাগে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দুই দেশের কৌশলগত পারমাণবিক যুদ্ধবন্দুকের সংখ্যা ১,৫৫০টি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখে এবং ডেটা বিনিময়, নোটিফিকেশন ও সাইট পরিদর্শনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় দু’দেশের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সহযোগিতা শেষ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে, যা শীতল যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা নিরাপত্তা কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
নিউ স্টার্টের পূর্বসূরি, ১৯৯১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বাক্ষরিত স্টার্ট চুক্তি, প্রতিটি পক্ষকে ৬,০০০টির বেশি পারমাণবিক যুদ্ধবন্দুক স্থাপন করা থেকে বাধা দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া এই চুক্তির উত্তরসূরি হিসেবে ২০১০ সালে নিউ স্টার্টে স্বাক্ষর করে, যা দুই দেশের বৃহত্তম পারমাণবিক মজুদকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। যদিও তিন বছর আগে প্রযুক্তিগতভাবে চুক্তি স্থগিত করা হয়েছিল, তবুও উভয় পক্ষ এখনও চুক্তির শর্তাবলী মেনে চলার দাবি করেছে।
চুক্তির সমাপ্তি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে উদ্বেগের নতুন পর্যায় উন্মোচিত করেছে। পোপ লিও আজ উভয় দেশকে চুক্তি নবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। একই সময়ে, ব্রিটেনের প্রাক্তন সামরিক প্রধান, অ্যাডমিরাল স্যার টনি রাডাকিন, এই ধরনের নিরাপত্তা কাঠামোর অবক্ষয়কে “বিশ্ব নিরাপত্তার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক” হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বিশ্বাসের ক্ষয়কে সতর্ক করেছেন।
রাশিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, যিনি নিউ স্টার্টে স্বাক্ষর করেছিলেন, তার সময়ে চুক্তি দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। চুক্তি না থাকলে উভয় পক্ষের কৌশলগত পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা গড়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ে, যা অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। যদি চুক্তি নবায়ন না হয়, তবে উভয় দেশই নিজেদের পারমাণবিক মজুদ বাড়ানোর স্বাধীনতা পাবে, যা ইতিমধ্যে চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া, অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলিও ভেঙে পড়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর সামগ্রিক দুর্বলতা নির্দেশ করে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, চুক্তি না থাকলে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ও প্রকারভেদ সম্পর্কে স্বচ্ছতা কমে যাবে, ফলে ভুল বোঝাবুঝি ও অপ্রত্যাশিত সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়বে। এদিকে, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মঞ্চে নতুন আলোচনার সূচনা হলে তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে উভয় পক্ষের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি এবং কৌশলগত স্বার্থের পার্থক্য নতুন চুক্তি গঠনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
অবশেষে, নিউ স্টার্টের সমাপ্তি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতির পুনর্বিবেচনা এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে নতুন কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য এখনই সময় এসেছে, যাতে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন চুক্তি বা সমঝোতা তৈরি হয়, যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি রোধ করা যায় এবং বৈশ্বিক শান্তি বজায় থাকে।



