৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার, রাজধানীর পারিবাগ সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে পারিবারিক সাহিত্যসভার আয়োজনের অংশ হিসেবে শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথাসাহিত্য নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের মূল শিরোনাম ছিল “শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথাসাহিত্য: মানুষের সংগ্রামের শিল্পরূপ”, যেখানে উপস্থিত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যপ্রেমীরা দুই লেখকের রচনায় গরিব মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে উপস্থাপনের দিকটি বিশ্লেষণ করেন।
শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস উভয়ই বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যাঁদের রচনায় সমাজের নিম্নবর্গের জীবনযাত্রা ও সংগ্রামকে গভীরভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। তাদের গল্পে গরিব মানুষকে কেবলমাত্র বর্ণগত বা আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং মানবিক গুণাবলীর দৃষ্টিতে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের শিক্ষার্থীদের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, যিনি সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট, ৬০-এর দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ৭০-এর দশকের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রভাবকে লেখকদের মানসিক গঠনে কীভাবে কাজ করেছে তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ঐ সময়ের সামাজিক অশান্তি ও মুক্তিযুদ্ধের তীব্রতা লেখকদের গরিব মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থনকে রূপান্তরিত করেছে, যা তাদের রচনায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
আনু মুহাম্মদ আরও জোর দিয়ে বলেন যে, এই দুই লেখকের কাজকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। তিনি অডিওবুক, ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম এবং অনুবাদের মাধ্যমে রচনাগুলোকে সহজলভ্য করার প্রস্তাব দেন। এধরনের ডিজিটাল উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে অতিরিক্ত সম্পদ সরবরাহ করে, ফলে তারা গল্পের গভীরতা ও সামাজিক বার্তা আরও স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করতে পারে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন নাঈমা তাসমিন, যিনি আলোচনার প্রবাহকে সুসংগঠিতভাবে পরিচালনা করেন। তাসমিনের মধ্যস্থতায় অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রচনায় বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির সঠিক পাঠ গ্রহণের জন্য অপরিহার্য দৃষ্টিকোণ রয়েছে। বিশেষ করে, গরিব মানুষের সংগ্রামকে কেন্দ্রীয় থিম হিসেবে তুলে ধরা এই রচনাগুলো শিক্ষার্থীদের সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে সহায়ক।
শিক্ষা ক্ষেত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই রচনাগুলোকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, অডিওবুকের মাধ্যমে গল্প শোনানো ক্লাসে শিক্ষার্থীরা শোনার দক্ষতা ও কল্পনাশক্তি বাড়াতে পারে, একই সঙ্গে গরিব মানুষের জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রচনাগুলোকে অনুবাদ করে বিভিন্ন ভাষায় উপস্থাপন করা হলে, দেশের বাইরে থেকেও বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধি সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়। এধরনের আন্তর্জাতিক প্রচার শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নতুন দৃষ্টিকোণ খুলে দেয়, যেখানে তারা নিজের সংস্কৃতির গর্ব ও দায়িত্ববোধ অনুভব করে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যদি এই রচনাগুলোকে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি অতিরিক্ত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে, তবে তারা গরিব মানুষের সংগ্রামকে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং বর্তমান সমাজের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্লেষণ করতে পারবে। ফলে, শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া সম্ভব হবে।
অবশেষে, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ব্যবহারিক টিপস: ক্লাসে অডিওবুকের অংশ শোনার পর, ছোট গ্রুপে গল্পের মূল বিষয় ও গরিব মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ করে আলোচনা করা। এই পদ্ধতি কেবল পাঠের গভীরতা বাড়ায় না, বরং দলগত কাজের দক্ষতা ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ক্ষমতাও উন্নত করে। আপনার ক্লাসে কি এমন কোনো ডিজিটাল উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা আছে? আপনার মতামত শেয়ার করুন।



