গাজিয়াবাদ, উত্তর প্রদেশ – ৩ ফেব্রুয়ারি রাতের গভীরে গাজিয়াবাদ শহরের এক বহুতল ফ্ল্যাটে তিন কিশোরী বোন আত্মহত্যা করে শেষ করে। ১২, ১৪ এবং ১৬ বছর বয়সের চেতনা কুমার, প্রাচী এবং আরেক বোন একসাথে নবম তলার বারান্দা থেকে নিচে লাফ দেয়।
বোনেরা ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে আটকে রাখার পর জানালার দিকে এগিয়ে যায়। একে একে জানালা দিয়ে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় তাদের চিৎকার ও ধাক্কার শব্দ আশেপাশের প্রতিবেশী, নিরাপত্তা কর্মী এবং ঘুমিয়ে থাকা পিতামাতার নিকট শোনা যায়। দরজা ভেঙে প্রবেশের চেষ্টা করলেও ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় সবকিছু শেষ হয়ে থাকে।
লাফ দেওয়ার আগে বোনেরা একটি হাতে লেখা নোট রেখে যায়। নোটে “সরি পাপা” লেখা এবং সঙ্গে একটি কান্নার ইমোজি চিত্রিত ছিল। নোটের পাশাপাশি একটি ছোট পকেট ডায়েরি পাওয়া যায়, যার আট পৃষ্ঠায় গেমিং অভ্যাস, মোবাইল ব্যবহারের সময়সূচি এবং মানসিক অবস্থার বিবরণ লিখে রাখা ছিল।
স্থানীয় পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তৎক্ষণাৎ মৃতদেহ নিশ্চিত করে। সহকারী পুলিশ কমিশনার অতুল কুমার সিং ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জানিয়েছেন, “আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে চেতন কুমারের তিন মেয়ে ভবন থেকে লাফিয়ে মারা গেছে।”
পরিবারের সূত্রে জানা যায়, বোনেরা কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকে একটি কোরিয়ান অনলাইন গেমে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে। গেমটির নাম “কোরিয়ান লাভ গেম” বলে জানা যায় এবং বোনেরা নিজেদেরকে কোরিয়ান নামেও ডেকেছিল। গেমের প্রতি তাদের আসক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা স্কুলে যাওয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়।
গেমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার ফলে বোনেরা প্রায় সব কাজ একসঙ্গে করত এবং বড় বোন প্রাচী (১৪) গেমের মধ্যে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করত। দুই বছর আগে তারা স্কুল ছেড়ে দেয়ার পর থেকে গেমিং তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রধান অংশ হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি বাবা-মা বোনেদের মোবাইল ফোনের ব্যবহার সীমিত করার চেষ্টা করেন। ফোনের ব্যবহার না পেয়ে বোনেদের মানসিক অবস্থা আরও ভেঙে যায় বলে পুলিশ অনুমান করে। ঘরের দেয়ালে “I am very lonely” এবং “My heart is broken” লেখা পাওয়া গিয়েছে, যা তাদের একাকিত্বের প্রকাশ।
বাবা চেতন কুমার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “তারা বলেছিল—কোরিয়াই আমাদের জীবন। আমরা এটা ছেড়ে দিতে পারব না। এমন দুঃখজনক ঘটনা আর কোনো পরিবারের মুখে না আসুক।” তিনি অনলাইন গেমিংয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে সকল অভিভাবকদের সতর্ক করার আহ্বান জানান।
পুলিশের মতে, আত্মহত্যার কারণের পূর্ণ তদন্ত চলমান। ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত সব প্রমাণ, নোট, ডায়েরি এবং গেমের লগ ফাইল বিশ্লেষণ করা হবে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আত্মহত্যা মামলায় ফার্মার (FIR) দায়ের করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট গেমের অপারেটরদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অধিক তদন্তে গেমের সরবরাহকারী, ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী এবং স্থানীয় মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। গৃহস্থালির মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতি সচেতনতা বাড়াতে এবং অনলাইন গেমিংয়ের অতিরিক্ত ব্যবহার রোধে স্থানীয় প্রশাসন বিশেষ কর্মসূচি চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই দুঃখজনক ঘটনার পর পরিবার ও সমাজের মধ্যে অনলাইন গেমিংয়ের প্রভাব নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একসাথে কাজ করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।



