সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে বুধবার থেকে ইউক্রেন, রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনার দ্বিতীয় দফা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। চার বছর ধরে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সমাপ্তি লক্ষ করে দুই দিনব্যাপী এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আবুধাবি আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের প্রধান হলের ভেতরে তিন দেশের প্রতিনিধিদের দল একত্রিত হয়েছে। ত্রিপক্ষীয় ফরম্যাটে আলোচনাটি পরিচালিত হবে, যেখানে প্রতিটি পক্ষের নিজস্ব দল আলাদাভাবে নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে এবং পরে সমন্বিত সিদ্ধান্তের জন্য যৌথ সেশনে একত্রিত হবে।
ইউক্রেনের প্রধান আলোচক রুস্তেম উমেরভ টেলিগ্রাম মাধ্যমে জানিয়েছেন, “আবুধাবিতে আলোচনার আরেকটি ধাপ শুরু হয়েছে। ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া এই ত্রিপক্ষীয় ফরমেটে এই আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হল।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, আলাদা দলগুলো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে এবং পরবর্তীতে একটি যৌথ বৈঠকে সব পক্ষের অবস্থান সমন্বয় করা হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হল যুদ্ধের অবসানের পথে নতুন অগ্রগতি তৈরি করা। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশাসন কিইভ ও মস্কোকে আপসের দিকে ধাবিত করার জন্য চাপ বাড়িয়ে আসছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক সত্ত্বেও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বড় পার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে কিইভের নিয়ন্ত্রণে থাকা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার দাবি এবং জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধ অব্যাহত।
জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্র ইউরোপের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা বর্তমানে রাশিয়ার দখলে রয়েছে। রাশিয়া এই কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও পরিচালনা সংক্রান্ত শর্তগুলোকে আলোচনার মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে।
মস্কোর অন্যতম প্রধান শর্ত হল কিইভকে দোনেৎস্ক অঞ্চলের সব শহর থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। দোনেৎস্ক অঞ্চল ইউক্রেনের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যুহ হিসেবে পরিচিত, এবং রাশিয়া এই দাবি দিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি চাচ্ছে।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বর্তমান ফ্রন্টলাইন অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে একতরফা সেনা প্রত্যাহার স্বীকার করা হচ্ছে না। কিইভের দল বলছে, কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের আগে উভয় পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে রাশিয়ান বাহিনী অতিরিক্ত প্রায় ১.৫ শতাংশ এলাকা দখল করেছে। এই পরিসংখ্যান যুদ্ধের গতিপথে নতুন পরিবর্তন নির্দেশ করে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জনমত জরিপে অধিকাংশ ইউক্রেনীয় নাগরিক ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার শর্তে কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে অনিচ্ছুক। কিইভের বাসিন্দারা আলোচনার ফলাফল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি অবিশ্বাসী দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখে।
৩৮ বছর বয়সী ট্যাক্সি চালক সের্হি একইভাবে তার মতামত প্রকাশ করেছেন: “অবশ্যই আশা করি কিছু একটা পরিবর্তন হোক। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না এখন কিছু বদলাবে। আমরাও ছাড় দেব না, তারাও দেবে না।” তার মন্তব্য দেশের সাধারণ মানুষের হতাশা ও দৃঢ়তা উভয়ই প্রতিফলিত করে।
আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে আলাদা দলগুলো যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে, সেগুলোর সমন্বয় করে একটি যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই সমন্বিত সেশনে সব পক্ষের অবস্থান একত্রিত করে চূড়ান্ত প্রস্তাবনা গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে মূল বিষয়গুলোতে এখনও বড় পার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে দোনেৎস্কের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্তগুলোকে নিয়ে সমঝোতা কঠিন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ত্রিপক্ষীয় ফরম্যাটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছাড়া কোনো সমঝোতা সম্ভব না হতে পারে, তবে একই সঙ্গে তার অবস্থানও রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি এই দ্বিতীয় দফা সফল হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও ধারাবাহিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে, যা যুদ্ধের সমাপ্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
অন্যদিকে, আলোচনার অগ্রগতি ধীর হলে উভয় পক্ষের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে পারে, যা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে আরও বেসামরিক ক্ষতি ঘটাতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি ও সমর্থন অপরিহার্য।
এই বৈঠকের ফলাফল ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশেও প্রভাব ফেলবে। যদি চুক্তি না হয়, তবে কিইভের সরকারকে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও জনমতের চাপ মোকাবেলা করতে হবে।
অবশেষে, ত্রিপক্ষীয় আলোচনার দ্বিতীয় দফা এখনও শুরু পর্যায়ে রয়েছে, এবং পরবর্তী কয়েক দিনই নির্ধারণ করবে যে এই প্রক্রিয়া সত্যিকারের সমঝোতার দিকে অগ্রসর হবে নাকি নতুন বাধার মুখোমুখি হবে।



