বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্যানোরামা বিভাগে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বপ্রদর্শনীতে ‘লালি’ নামের প্রথম সম্পূর্ণ পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের সূচনা হয়। এই চলচ্চিত্রটি পাকিস্তানের চলচ্চিত্র নির্মাতা সারমাদ সুলতান খূসাতের পরিচালনায় তৈরি, এবং উৎসবে প্রথমবারের মতো একক পাকিস্তানি ফিচার হিসেবে মঞ্চ পায়। উৎসবের ইতিহাসে পূর্বে পাকিস্তানি সহ-উৎপাদিত চলচ্চিত্র দেখানো হলেও, ‘লালি’ সম্পূর্ণ দেশীয় উৎপাদন হিসেবে আলাদা স্বীকৃতি পায়।
সারমাদ সুলতান খূসাতের নাম ইতিমধ্যে পাকিস্তানি সিনেমার মানচিত্রে উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ‘সার্কাস অফ লাইফ’ এবং ‘জয়ল্যান্ড’ সহ বহু স্বীকৃত কাজের স্রষ্টা, যেখানে ‘জয়ল্যান্ড’ কান্সে জুরি পুরস্কার জিতেছে এবং দুটোই পাকিস্তানের অস্কার প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। তার পূর্বের চলচ্চিত্র ‘কমলি’ তেও মানবিক অনুভূতির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দেখা যায়, যা ‘লালি’ তেও ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পাবে।
‘লালি’ এর বিশ্বপ্রদর্শনী বার্লিনের প্যানোরামা সেকশনে অনুষ্ঠিত হয়, যা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চলচ্চিত্রটি ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইন ডে’র সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রেমের যুদ্ধের থিমকে তুলে ধরেছে। এই সময়ে উৎসবে উপস্থিত দর্শকরা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রেমের জটিলতা ও সংঘর্ষ অনুভব করার সুযোগ পায়।
চলচ্চিত্রের মূল কাহিনী জেবার চারপাশে ঘোরে, যিনি সদ্য সজাওয়াল নামের এক অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জেবার পূর্বে তিনজন প্রিয়জনের মৃত্যু ঘটেছে, ফলে তার জীবনে অশুভতার ছাপ রয়ে গেছে। সজাওয়াল তার স্ত্রীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে আত্মদেবতার ভান করে, যা তার মানসিক অস্থিরতা ও ভয়কে প্রকাশ করে। জেবা দু’জন নারীর সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তোলেন: তীক্ষ্ণ ভাষার মা-সুন্দরী শোনি আম্মি এবং শান্ত, জ্ঞানী প্রতিবেশী ভোলি।
চলচ্চিত্রে মম্যা শাজাফার, চ্যান্নান হানিফ, রাস্তি ফারুক, ফারাজেহ সায়েদ এবং মেহর বানো প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই অভিনেতা-অভিনেত্রীরা জেবা ও সজাওয়ালের জটিল সম্পর্কের বিভিন্ন দিক—ইচ্ছা, অন্ধবিশ্বাস, ভয়—কে জীবন্ত করে তোলেন। তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া ও সংলাপের মাধ্যমে দাম্পত্যের গোপন দিকগুলো উন্মোচিত হয়, যা দর্শকের মনের গভীরে প্রভাব ফেলে।
‘লালি’ খূসাত ফিল্মস এবং এনসো ফিল্মসের যৌথ উদ্যোগে উৎপাদিত। উভয় সংস্থা পূর্বে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের গুণগত মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সহযোগিতা চলচ্চিত্রের বর্ণনা, চিত্রায়ণ এবং সাউন্ড ডিজাইনে উচ্চ মান বজায় রাখতে সহায়তা করে। উৎপাদন দলটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সমর্থন পেয়ে চলচ্চিত্রের সৃজনশীল দিককে শক্তিশালী করেছে।
চিত্রগ্রহণে কাজ করেছেন কাইজার ইদ্রিস, যিনি ‘মান্টো’ এবং ‘সার্কাস অফ লাইফ’ এর সিএফও হিসেবে কাজ করেছেন। এডিটিং দায়িত্বে ছিলেন সাইম সাদিক, যিনি ‘জয়ল্যান্ড’ এর এডিটর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাদের পেশাদারী দক্ষতা ‘লালি’ তে দৃশ্যের গতি, টোন এবং আবেগের সূক্ষ্ম সমন্বয় ঘটায়, ফলে চলচ্চিত্রের বর্ণনা আরও প্রভাবশালী হয়।
চলচ্চিত্রের মূল থিম হল ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নিচে লুকিয়ে থাকা ভয়, লজ্জা এবং সহিংসতার বিশ্লেষণ। গল্পটি মানবিক জটিলতা ও দমিত আবেগকে উদ্ঘাটন করে, যা বহু দম্পতির মধ্যে গোপনে বিদ্যমান হতে পারে। নির্মাতারা এই বিষয়গুলোকে সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করে, যাতে দর্শকরা নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করতে পারেন এবং সামাজিক আলোচনায় অংশ নিতে পারেন।
‘লালি’ এর বিশ্বপ্রদর্শনী আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতে পাকিস্তানি সিনেমার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ভ্যালেন্টাইন ডে’র সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রেমের যুদ্ধের উপমা দিয়ে চলচ্চিত্রটি দর্শকদের হৃদয়কে স্পর্শ করে, একই সঙ্গে দাম্পত্যের গোপন কষ্ট ও দমিত শক্তিকে আলোকিত করে। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রশিল্পের সৃজনশীলতা ও বর্ণনামূলক গভীরতা বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি পাবে বলে আশা করা যায়।



