চীনের সিচুয়ান প্রদেশে দুইজন স্বাধীন তদন্তমূলক সাংবাদিককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। লিউ হু (বয়স ৫০) এবং উ শিংজিয়াও (বয়স ৩৪) রবিবারের পরেই তাদের প্রকাশিত দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে আটক হয়। ঘটনাটি মানবাধিকার সংস্থা ও মিডিয়া স্বাধীনতা সমর্থকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
চেংদু পুলিশ সোমবার জানিয়ে দেয় যে লিউ ও উ দুজনকে “মিথ্যা অভিযোগ করা” এবং “অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা” করার অভিযোগে তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। দুজনের নাম কেবল উপাধি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে তাদের বয়স ও তদন্তের প্রকৃতি স্পষ্ট করা হয়েছে। সরকার থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
চীনের মিডিয়া পরিবেশে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের পটভূমি রয়েছে; কর্তৃপক্ষ প্রায়শই সাংবাদিকদেরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রেফতার বা বিচার করে। মানবাধিকার গোষ্ঠী উল্লেখ করে যে, এই ধরনের পদক্ষেপগুলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও প্রকাশের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে।
লিউ হু পূর্বে ২০১৩ সালে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগের পর দোষারোপের ভিত্তিতে গ্রেফতার হন। সেই সময়ে তাকে মানহানি সন্দেহে আটক করা হয় এবং ২০১৪ সালে মুক্তি পায়। মুক্তির পরেও তিনি তদন্তমূলক কাজ চালিয়ে যান এবং সামাজিক মিডিয়ায় তার প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছেন।
মুক্তির পর লিউ চীনের অন্যতম পরিচিত তদন্তমূলক সাংবাদিক হিসেবে কাজ চালিয়ে গেছেন। তিনি সামাজিক নেটওয়ার্কে, বিশেষ করে উইচ্যাটে, বিভিন্ন দুর্নীতি কেসের বিশদ প্রকাশ করে পাঠকদের জানিয়ে আসছেন। তার কাজের ফলে বহু সরকারি প্রকল্পের অস্বচ্ছতা উন্মোচিত হয়েছে।
উ শিংজিয়াও লিউয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। উ দুজনের যৌথভাবে পরিচালিত একটি পাবলিক উইচ্যাট অ্যাকাউন্টে নিয়মিতভাবে সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। এই অ্যাকাউন্টটি চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের দুর্নীতি কেসের তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছিল।
চীনা মানবাধিকার রক্ষক গোষ্ঠী, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সক্রিয়দের সমন্বয়ে গঠিত, জানায় যে লিউ রবিবার চংকিং থেকে বেইজিং যাওয়ার জন্য ট্রেন ধরতে যাচ্ছিলেন, তখনই তিনি অচেনা অবস্থায় নিখোঁজ হন। গোষ্ঠীটি লিউয়ের নিখোঁজ হওয়ার পরপরই উ শিংজিয়াওকে হেবেই প্রদেশে পুলিশ গ্রেপ্তার করে বলে জানায়।
উ শিংজিয়াও একই দিনে হেবেই প্রদেশে পুলিশ দ্বারা আটক হয়। উ’র গ্রেফতারও লিউয়ের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সমন্বিতভাবে ঘটেছে, যা উভয়ের একই রিপোর্টের প্রকাশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে অনুমান করা হচ্ছে। উ’কে এখনও একই অভিযোগে তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।
দুজনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একটি কাউন্টি কর্মকর্তার সন্দেহজনক দুর্নীতির কথা উন্মোচিত হয়। প্রতিবেদনের শিরোনামটি উল্লেখ করেছিল যে, ওই কর্মকর্তার কার্যক্রমের ফলে বহু ব্যবসা দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরই উইচ্যাট থেকে মুছে ফেলা হয় এবং এখন আর কোনো পাবলিক রেকর্ডে পাওয়া যায় না। এই ঘটনার ফলে তথ্যের স্বচ্ছতা ও প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
লিউ গ্রেফতারের আগে চেংদু শৃঙ্খলা পরিদর্শন বিভাগের এক কর্মকর্তা থেকে বার্তা পেয়েছিলেন, যেখানে তাকে মিডিয়ায় প্রকাশের বদলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। লিউ এই বার্তাগুলোকে উইচ্যাটে শেয়ার করে তার অনুসারীদের জানিয়েছিলেন।
মানবাধিকার রক্ষক গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া স্বাধিকার সংস্থা এই গ্রেফতারকে চীনের সাংবাদিকদের ওপর বাড়তে থাকা দমন নীতির একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা দাবি করে যে, কোনো স্পষ্ট আইনি প্রমাণ ছাড়া সাংবাদিকদেরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন।
ভবিষ্যতে কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে তা এখনও অনিশ্চিত। তবে উভয় সাংবাদিকের ওপর বর্তমান অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতে মামলা চালু হলে, তা চীনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিডিয়া স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মানবাধিকার গোষ্ঠী এই মামলাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।



